বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২৬
২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব জরুরি পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করব?
মুশতাক হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৪ এএম আপডেট: ১০.০৮.২০২৬ ২:০৩ এএম |

 হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব জরুরি পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করব?
হামের প্রকোপে যখন শত শত মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছিল এবং প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছিল, তখন আমরা (জনস্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করি) বললাম এটা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি। কিন্তু সরকার শুরুতে মহামারি বা জরুরি পরিস্থিতি-কোনোটিই স্বীকার করতে চায়নি; বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেছে। অথচ শিশুদের হামজনিত মৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই মহামারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারি থেকে নজরে এলেও মার্চ-এপ্রিল থেকে কার্যক্রম জোরদার করা হয়। এরপরও চার-পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হামের শনাক্তকরণ ও লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুপরিচিত। কিন্তু সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরোনো ধাঁচকেই অবলম্বন করে আছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফল দিচ্ছে না।
২০২৩ সালে যখন ডেঙ্গুতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছিল এবং দশকের ঘরে মৃত্যুবরণ করছিল, তখনো আমরা তাকে মহামারি ও জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছিলাম। তৎকালীন সরকারও একই সুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে শুধু বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন প্রাদুর্ভাব বলে বর্ণনা করে। সে সরকারও বলেছিল, এটি জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি নয়, সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা দেখেছি, প্রচলিত পদ্ধতিতে কাজ করে সরকার ডেঙ্গুতে অসংখ্য মৃত্যুকে ঠেকাতে পারেনি। অথচ এ মৃত্যু কমানোর চিকিৎসা (লক্ষণভিত্তিক) পদ্ধতিও মেডিকেল সায়েন্সে অজানা নয়।
জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির জন্য কে কী কাজ করবে তা নির্ধারণ করে স্থায়ী আদেশ (স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি) প্রণীত হওয়া প্রয়োজন। এতে শুধু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় নয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যের দুর্যোগে কে কী দায়িত্ব পালন করবে তা লিখিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এজন্য নির্দিষ্ট পদধারীকে (ফোকাল পয়েন্ট) নির্ধারণ করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ইতোমধ্যে দুর্যোগের স্থায়ী আদেশ (স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার) প্রণীত হয়েছে। প্রায় ৩৫টি মন্ত্রণালয়ে এজন্য নির্দিষ্ট পদে থাকা ব্যক্তিবর্গ নির্ধারণ করা আছে। পদে থাকা ব্যক্তি বদলি হলে নতুন যিনি আসেন তিনি এ দায়িত্ব নেন। দুর্যোগ সৃষ্টি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যার যার দায়িত্ব পালনে নেমে পড়েন, নতুন করে কোনো সরকারি আদেশের অপেক্ষা করার দরকার হয় না। বেসরকারি সংস্থাগুলো (যেমন রেড ক্রিসেন্ট) একইভাবে নতুন করে কারও আদেশের অপেক্ষায় বসে না থেকে কাজে নেমে পড়ে। এ ধরনের আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ আজ বিশ্বে দুর্যোগ মোকাবিলায় অনুসরণীয় উদাহরণ। স্বাস্থ্য দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন আমরা অনুরূপ উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারব না?
দ্বিতীয়ত, জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজনে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে তা পূর্বেই আইন দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে। সংক্রামক ব্যাধি (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮ স্থানীয় পর্যায়ে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট হলেও ব্যাপক প্রাদুর্ভাব, মহামারি কিংবা বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। ইতোমধ্যে করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি ২০০৫-কে হালনাগাদ করেছে, বৈশ্বিক মহামারি-বিষয়ক চুক্তি (প্যানডেমিক অ্যাগ্রিমেন্ট) গৃহীত হয়েছে। সবগুলো মিলিয়ে আমাদের সংক্রামক ব্যাধি আইন-২০১৮-কে আরও বিশদ ও হালনাগাদ করতে হবে। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশের রোগ নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও আধুনিক করতে হবে। উল্লেখ্য, ডেঙ্গু এখন প্রতি বছরেই অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রাদুর্ভাব হচ্ছে প্রতি বছর। আর চার বছর পরপর হচ্ছে মহামারি। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে ডেঙ্গু মহামারি প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। আগামী ২০২৭ সালে যে পরিস্থিতি হতে পারে তার জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। নিয়মিত রোগ নজরদারির তালিকাতে ডেঙ্গু নেই। কয়েকটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক কেন্দ্র যেসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসে পাঠায় তা বিশ্লেষণ করেই রোগের প্রবণতা বের করছেন রোগতত্ত্ববিদরা। এটি অনেকটা পরোক্ষ ও অসম্পূর্ণ নজরদারি ব্যবস্থা। কিন্তু নজরদারি হতে হবে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়। যেমনটি ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিপাহ, পোলিও ইত্যাদি রোগের জন্য রয়েছে। শুধু হাসপাতালেই নয়, জনগোষ্ঠীর মাঝেও ডেঙ্গু রোগ নজরদারি থাকতে হবে। জনগোষ্ঠীকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন তারা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং নিজেরাই রোগের প্রবণতা ধরতে পারে। তাহলে অতি দ্রুত যেকোনো জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত হবে এবং শুরুতেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
চতুর্থত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। বর্তমান সরকার নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর (কমিউনিটি) মাঝে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি করার জন্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মহানগরাঞ্চলে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা হবে। তবে জনসংখ্যা অধিক হলে মহানগরাঞ্চলে ওয়ার্ডে একাধিক, অনুরূপভাবে গ্রামাঞ্চলে ইউনিয়নে একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হতে পারে। জনস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই-এমন ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান সেখানেই করা সম্ভব হয়। বাকি ১০ থেকে ২০ ভাগ স্বাস্থ্য সমস্যা মাধ্যমিক বা দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (যেমন-উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল, মহানগর হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতালের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাসপাতাল) ব্যবস্থাপনা করা হবে, প্রয়োজনে এখানে রোগী ভর্তি করে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে। এখান থেকে শুধু জটিল রোগীরাই (অবশিষ্ট শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ) তৃতীয় বা বিশেষায়িত (টরসিয়ারি) পর্যায়ে যাবে, তাদের বেশির ভাগকেই হাসপাতালে ভর্তি দরকার হবে। সরকারের এ বিষয়ে আরও একটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সরকার সব মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবে। আমরা চাই জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও বিনামূল্যে সবাইকে দেওয়া হোক।
প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য নিশ্চিত হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রই যেকোনো জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি গোড়াতেই সামাল দিতে পারবে। শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাই নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে জনগোষ্ঠীর (কমিউনিটি) মাঝে রোগ নজরদারি, রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভবিষ্যৎ মহামারির প্রস্তুতিতে এখন জনগোষ্ঠীভিত্তিক প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, অজানা কিংবা পরিচিত-জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো রোগ প্রথমে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে; পরে সীমান্ত পেরিয়ে দেশ-দেশান্তরে বিস্তৃত হয়। বিগত দুটি বৈশ্বিক মহামারি-২০০৯ সালের প্যানডেমিক ইনফ্লুয়েঞ্জা (সোয়াইন ফ্লু) ও কোভিড-১৯ বিমানপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও আমরা সেগুলো বিমানবন্দরে নয়, জনগোষ্ঠীর মধ্যেই শনাক্ত করেছি। সোয়াইন ফ্লু শনাক্ত হয়েছিল ঢাকার মিরপুরে, আর কোভিড-১৯ নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরের শিবচরে।
সেটা তো গেল অন্য দেশ থেকে আসা সংক্রামক ব্যাধির কথা, যেগুলো বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই আমরা অনেকটা জেনে গিয়েছিলাম। ফলে রোগতত্ত্ববিদরা সতর্ক থেকে সেগুলো শনাক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে যদি বৈশ্বিক মহামারি ঘটাতে সক্ষম কোনো নতুন রোগের উৎপত্তি হয়, তাহলে প্রথম ধাক্কা সামলাতে হবে বাংলাদেশকেই। আর তা মোকাবিলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও আধুনিক করার কোনো বিকল্প নেই।
এমন শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে হামসহ যেকোনো সংক্রামক রোগের বিস্তার শুরুতেই তার উৎপত্তিস্থলের পাড়া বা গ্রামের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব। একইভাবে কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সেখানেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জনগোষ্ঠীকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা অত্যাবশ্যক।
শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু সংক্রামক ব্যাধিকেই নয়, অসংক্রামক ব্যাধি (যেমন-ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার) প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে শুরু থেকেই। আমরা আশা করি, সরকার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। আগামী বছরে যেন এ বছরের মতো হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক ব্যাধিতে ক্ষয়ক্ষতি না হয় আমরা সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকব।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২