বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২৬
২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সুনন্দাদি
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১:৩৭ এএম আপডেট: ১১.০৮.২০২৬ ২:১২ এএম |

  সুনন্দাদি
আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।।
রক্তের বা বংশের বহির্ভূত সম্পর্ক যে কত শক্তিশালী হতে পারে তা আমি প্রতিক্ষণ অনুভব করি। ৪ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার দৈনিক কুমিল্লার কাগজে ‘খোলা জানালা’ কলাম পাতায় আমার শ্রদ্ধেয় দিদি সুনন্দা কবীর-এর আখতার হামিদ খান সাহেবের উপর অসাধারণ একটি লেখার নীচে আমার একটি লেখা ‘জোড়া শালিকের শততম সাহিত্য আড্ডা: একশত অভিনন্দন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। সুনন্দা কবীর আমার দিদি, তাঁর লেখার সঙ্গে আমার লেখাটি থাকায় আমি আনন্দিত, গর্বিত। প্রশ্ন- কেন? তিনি আপনার দিদি হতে যাবেন কেন : সংগত প্রশ্ন, অসংগত মনের সংকীর্ণতা। এ নিয়ে দুটি কথা।
আমরা জানি, সুনন্দাদির বাবা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক, রবীন্দ্র- স্নেহভাজন। কথিত কবির উক্তি- ‘আমার সুধীর বাংলা জানে (?) অধ্যাপক সুধীর সেন। তার মাতৃদেবী অধ্যাপিকা সুধা সেন। আমাদের প্রজন্মের নিকট মমতাময়ী বিদুয়সী মাসিমা। সুগায়িকা-সুলেখিকা- সমাজসেবিকা এবং বিশেষত হিন্দু নারীদের পারিবারিকভাবে স্বাধীন জীবনযাপনের জন্য সংগ্রামী সহযোগী যোদ্ধা। সে ইতিহাস ভিন্ন ও তাৎপর্যপূর্ণ।
আমার বাবা স্বর্গীয় ইন্দুভূষণ ভৌমিক, মাতা স্বর্গীয় প্রভাবতী ভৌমিক তাঁরা যথাক্রমে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও গৃহিণী। সুতরাং এদিক বিবেচনা করলে সুনন্দাদি আমার দিদি নন, তবে দিদি। আমার প্রশ্ন- সুনন্দা সেন, বিয়ের পর অনেকসময় মেয়েদের পদবী বদলায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা-
‘বাবা বদল গোত্র বদল
বদল হলো পদবী
এক নিমেষে শেষ হয়ে গেলো
 মেয়ে বেলাকার ছবি’। (উদ্ধৃতি ভুল হতে পারে)
কিন্তু সুনন্দা সেন অন্যসব হিন্দু পদবী ধারণ না করে ‘কবীর’ পদবী কেন ? সহজ উত্তর- ‘কবীর’ সাহেবের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, তাই পদবী বদল হয়েছে। তাতে আর কোনো ‘কিন্তু’ নেই। যারা ‘কিন্তু’ নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন, আমি তাদের মানুষ বলি না।
সুতরাং সুনন্দাদি কুমিল্লার মেয়ে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে একসময় কুমিল্লা বার্ডে আখতার হামিদ খান সাহেবের সহযোগিতায় চাকরি করেছেন। খান সাহেব তাঁকে কন্যাজ্ঞানে স্নেহ করতেন। এছাড়া ভিক্টোরিয়া কলেজে খানসাহেব যখন অধ্যক্ষ ছিলেন, তখন সুনন্দাদি ছাত্রী ছিলেন হয়ত বা। এছাড়া খান সাহেব ও সুধীর সেন মহাশয় তো সহকর্মী ছিলেন। তাহলে তিনি আমার দিদি হতে যাবেন কেন ? তা কি কোনো পোষাকী দিদি ? বিষয়টি তেমন নয়। তিনি কুমিল্লায় থাকেন না, ঢাকায় আছেন, ইদানিং কুমিল্লায় যাতায়াত বেড়েছে, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রটি প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে তিনি তাঁর বাবা-মার নামে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে একটি বৃত্তিপ্রদানমূলক ট্রাস্ট ‘সুধীর-সুধা’ নামে চালু করেছেন। আস্তে আস্তে কুমিল্লামুখী হচ্ছেন, আমাকে এ ধারায় তাঁর পাশে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিয়েছেন। আরও অনেক কথা। পাতানো দিদি নন, সত্যিকারের দিদিতে আমাকে আলোকিত ও বিকশিত করেছেন।
আবারও প্রশ্ন সুনন্দাদি আমার দিদি হলেন কিভাবে ?
পেছনের একটি ঘটনার কথা বলব। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় জগন্নাথ কলেজের বাংলার অধ্যাপক অজিত কুমার গুহকে পাকিস্তান গোয়েন্দাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। তখন অজিত গুহ ওয়ারী রেংকিনস্ট্রীটে বসন্তদাসের বাসায় থাকতেন। কয়েকদিন পর ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালে আবার পাকিস্তানী ৯০ ক ধারায় অনেকের সঙ্গে গ্রেপ্তার করে নিয়ে জেলে রেখে দেয়। ঐ বাসায় তখন ফজলে করীম, জগন্নাথ কলেজের ছাত্র, গুহবাবুর সঙ্গে থাকতেন, কলেজ থেকে আগেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আর থাকতেন পটুয়া-শিল্পী কামরুল হাসান। অজিতকুমার গুহকে নিয়ে যাওয়ার পরের দিন তাঁর বাসা তল্লাসী করতে একদল পুলিশ আসে। এসেই কামরুল হাসানকে দেখতে পায়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়- ‘আপনি কি এ বাসায় থাকেন ?’ তিনি বলেন- ‘হ্যা’। আপনার নাম কি ? বলেন- ‘কামরুল হাসান।’ ‘কামরুল হাসান ? অজিতগুহ হিন্দু, আপনি মুসলমান- ছাত্র নাকি ?’ দৃঢ়ভাবে উত্তর- ‘না। তিনি আমার দাদা।’ পুলিশ অফিসার ধমক দিয়ে বলে ‘একজন হিন্দু একজন মুসলমানের দাদা হয় কিভাবে’ ? কামরুল হাসানের সেই অসাধারণ উক্তি- ‘তা আপনারা বুঝবেন না।’
তাই বলছি- সুনন্দাদি আমার দিদি হন কিভাবে তা আপনারাও বুঝবেন না। তবে তাঁকে সুযোগ পেলে জিজ্ঞাসা করে নিবেন।’
যদি আমরা প্রকৃত মানুষ হই, কোনো মা-বাবার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছি, তা কি এতটাই জরুরি ? কথায় তো বলি (গানে)- ‘মানুষ মানুষের জন্য’। তারপর প্রশ্ন কেন ? তার শেকড় নিয়ে টানাটানি কেন, চন্ডিদাস যখন বলেন-
‘শুনরে মানুষ ভাই-
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।’
পৃথিবীটা বোকাদের জন্য, না বোকারা পৃথিবীর জন্য বুঝে উঠতে পারি না। এতটুকু জেনে রাখুন- সুনন্দা কবীর আমার দিদি। দিদির লেখার পাশে আমার লেখা, যেন ভাইবোনের মেলবন্ধন, বিষয়বস্তু যা-ই হোক না কেন ?












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২