কিছুদিন
আগে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে একটি দাবি সামনে এসেছে, এমবিবিএস ও বিডিএস
ডিগ্রি ছাড়া কেউ যেন নামের আগে ‘ডাক্তার’ শব্দটি ব্যবহার না করেন। বিষয়টি
নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ পক্ষে
কথা বলছেন, কেউ বা বিপক্ষে। ওই বিতর্কে কুয়েটের একজন প্রকৌশলী সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যারা নামের আগে ‘চিকিৎসক’ লিখতে চান, তারা নামের
আগে ‘প্রকৌশলী’ লিখতে পারেন। কারিগরি কর্মক্ষেত্রের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে
দেশের এই মেধাবী প্রকৌশলীর এমন বক্তব্য আমাকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে
দাঁড় করিয়েছে, একজন প্রকৌশলীর আসল কাজ কী?
দরিদ্র জনগণের ট্যাক্সের
টাকায় পরিচালিত শিক্ষার প্রতিটি বিষয় পাঠের পেছনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও
উদ্দেশ্য থাকে। চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, হিসাববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, বাংলা,
ইংরেজি, গণিত, চারুকলা, সংগীত—এমন শতাধিক শাখা নিয়ে আমাদের শিক্ষার
ব্যাপ্তি। প্রতিটি বিষয়ই মানুষের প্রয়োজন মেটাতে, সমাজকে এগিয়ে নিতে এবং
রাষ্ট্রের মানবসম্পদকে নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ করে তোলার জন্যই প্রণীত হয়েছে।
দেশে
সঠিক কোনো মানবসম্পদ পরিকল্পনা না থাকায়, কোন পেশায় কত জনশক্তির প্রয়োজন
তার কোনো হিসাব শিক্ষা বিভাগের কাছে নেই। ফলে শিক্ষার মূল
লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে শিকেয় তুলে কে কোন পেশার মানুষ হয়ে কোথায় শ্রম দিয়ে
যাচ্ছেন, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। দেশের মানুষ দেখছে, একজন
চিকিৎসক এসপির দায়িত্ব পালন করছেন, আবার একজন প্রকৌশলী এজলাসে বসে বিচার
করছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি প্রকৌশলী মহোদয় মন্তব্য করে থাকেন, তবে
কিছু বলার থাকে না। তবে তার বক্তব্যের সুরের মধ্যে একটা শ্লেষের গন্ধ পাওয়া
যায়।
সাধারণভাবে প্রতিটি স্কুলেই শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের মন দিয়ে
পড়াশোনা করে মানুষ হতে বলতেন। কারণ শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী করে, শিক্ষা
মানুষকে সুজন করে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই বোধ হয় একমাত্র
ব্যতিক্রম, যা মানুষকে বিনয়ী কিংবা সুজন কোনোটাই করে না। ওই কারণেই হয়তো
প্রজাতন্ত্রের মালিকেরা যাতে প্রজাতন্ত্রের মাস-মাইনের বেতনভুক্ত সেবকদের
‘স্যার’ বলতে বাধ্য হন, ওই দাবিতে বেতনভুক্ত সেবকেরা আন্দোলনে নামেন!
নিজ
পেশার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেয়ে এ দেশের একশ্রেণির মানুষ অপরের
পেশায় গিয়ে সেবা দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকেন; একে অপরের ওপর মাতবরি করতেই
তারা সর্বশক্তি নিয়োজিত করেন। এমন বিচিত্র মানসিকতার শিক্ষা বিশ্বের অন্য
কোনো দেশে আছে কি না জানি না, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই শিক্ষিত জনবলই
তৈরি করেছে। এখানে পেশাজীবী শিক্ষিত সমাজ একে অপরের পরিপূরক না হয়ে হয়ে
উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বী।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোটাই যেন স্বপ্নের ওপর
নির্ভরশীল। নীতি-নির্ধারণী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কে, কখন, কীভাবে, কী
স্বপ্ন দেখবেন তা অনুমান করা কঠিন। পরিকল্পনাহীন এই শিক্ষাব্যবস্থার কারণে
বিশ্বখ্যাত পেশাজীবী তৈরির স্বপ্ন দেখিয়ে একের পর এক বিষয়ভিত্তিক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং ওই প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।
দেশের
খ্যাতনামা বহু শিক্ষাবিদ এই বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বব্যাপী
সর্বজনীন বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে মেলাতে চান, কিন্তু মিল খুঁজে পান না।
যদিও শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তাতে কিছুই যায়-আসে না।
তাই প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা, বস্ত্র ও চামড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর
আরও অনেকে উৎসাহিত হয়ে আইন, শিল্পসহ বিচিত্র সব বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন এবং সরকারও প্রাথমিকভাবে তা অনুমোদন দিয়ে দেয়। দেশের
শিক্ষিত সমাজ তো এখন আবার জেলায় জেলায় বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে!
মজার বিষয় হলো, এসব বিষয়ভিত্তিক
বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্ব-পেশার কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনই দেয় না; এরা
নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিজেরাই আঁকড়ে রাখে। আর স্ব-পেশার প্রতিষ্ঠানগুলোর
অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে হয় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে!
সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই অসাধারণ বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর
সরকারি পরিচালনা ব্যয় কিন্তু অনেক অনেক বেশি। এখানে সাধারণ জনগণের প্রশ্ন
তোলার অধিকার নেই। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় জীবনে ঠিক কী অবদান
রাখছে, তা নিয়ে তো প্রশ্ন করাই যায়। যদিও আমাদের মসনদপ্রেমীদের ভূত-ভবিষ্যৎ
নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার অবকাশ নেই, জনগণের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার
দায়ও নেই। তাদের একমাত্র ব্রত, কঠোর সাধনায় নিজেকে দেবী চৌধুরাণী প্রমাণ
করা, আর ব্রজেশ্বরের দেখা পাওয়ামাত্র তার তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে সংসারে ফিরে
যেতে ব্যাকুল হওয়া।
দেশের এমবিবিএস চিকিৎসকেরা জনগণের উন্নত চিকিৎসাসেবা
নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে কোনো এক ব্রজেশ্বরের সহযোগিতায় এলএমএফ
কোর্স বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফল কী হয়েছে? আজও দেশের সাধারণ মানুষের
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাসেবা হয়ে পড়েছে
বিদেশনির্ভর, আর দেশের নিরক্ষর ও অনাহারী মানুষগুলো প্রায় পুরোপুরিই সেবার
আওতার বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে চিকিৎসকের তুলনায় নার্স অর্ধেক, আর
স্বাস্থ্য টেকনিশিয়ানের সংখ্যা তো কোনো অনুপাতেই পড়ে না। এমন ভারসাম্যহীন
জনবল দিয়ে পরিচালিত চিকিৎসাসেবার ফল জনগণ প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
দেশের
প্রকৌশলীরা চিকিৎসকদের মতো একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সফল না হলেও চেষ্টা
থামাননি। তারা কারিগরি কর্মকাণ্ড পরিচালনার পিরামিড কাঠামোটাকে উল্টে দিতে
সক্ষম হয়েছেন। নিজেদের অযোগ্যতার প্রমাণ ঢাকতে তারা পিরামিডের অন্যান্য
স্তরের শিক্ষাক্রমকে নিম্নমানের করার সমস্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু
সাধারণ জনগণসহ দেশের বিজ্ঞজনেরা ভালো করেই জানেন, আমাদের কারিগরি
কর্মক্ষেত্রের ৮০-৯০ ভাগ কাজই হলো তদারকি বা তত্ত্বাবধানের। কিন্তু
প্রকৌশলীদের শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধুই তদারকি করা? তাহলে মধ্যম শ্রেণির
কারিগরি জনশক্তির কাজটা কী?
যদি দুই ধরনের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
একই হয়ে থাকে, তবে সবার নামের আগে একই পরিচিতি ব্যবহারে বাধা কোথায়? এমনকি
দক্ষ জনশক্তি যখন পদোন্নতি পেয়ে একই দায়িত্বে উন্নীত হয়, তখন তাদের তো একই
পরিচিতি পাওয়ার কথা, তাই নয় কি? এতে তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। একই কাজ
করলে পরিচিতির এই ভিন্নতা শোভন দেখায় কীভাবে?
এই বিষয়টি নিয়ে রাগ করা যায়, অভিমান করা যায়, ক্ষমতার দাপট দেখানো যায়, কিন্তু কোনো যুক্তি কি উপস্থাপন করা যায়?
দেশের
সাধারণ মানুষ দেখেছে, এ দেশের মেধাবী সন্তান প্রকৌশলীরা একটি যমুনা সেতু
দেখে নিজেদের প্রযুক্তিতে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারেননি, লালন সেতুও
করতে পারেননি। দেশের কলকারখানাগুলো লোকসানের ভারে একের পর এক বন্ধ হয়ে
গেছে, তাও রক্ষা করতে পারেননি। দেশের একটি ব্যারেজও নেই, যা মূল লক্ষ্য ও
উদ্দেশ্য পূরণে সফল হয়েছে।
আজ প্রকৌশলীদের পুরো কাজটাই বিদেশনির্ভর।
তারা শুধু তদারকির দায়িত্ব নিয়ে দশ হাজার কোটি টাকার সেতু ত্রিশ হাজার কোটি
টাকায় শেষ করেন। তাহলে আবার ওই গোড়ার প্রশ্নেই ফিরে যেতে হয়, একজন
প্রকৌশলীর আসল কাজ কী? কেবল নিজের পেশাগত পরিচয় নিয়ে গর্ব করা? অন্য পেশার
পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা? নাকি নিজের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের
কল্যাণে ব্যবহার করা?
দেশে বৈষম্য সৃষ্টির প্রথম ধাপই হলো এই
শিক্ষাব্যবস্থা। যার সূচনা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে হলেও পুরো
শিক্ষাব্যবস্থাজুড়েই তার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। আর এই বৈষম্যের মূল
সূতিকাগার হলো বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের
শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন নয়। প্রয়োজনীয় সমাজবিজ্ঞান
শিক্ষা এখানে না থাকার ফলে এবং পেশাশিক্ষাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ায়
শিক্ষার্থীদের এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
সাধারণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী একসঙ্গে থেকে, একসঙ্গে চলে, পরস্পরের
সঙ্গে চিন্তার আদান-প্রদান করে নিজেকে মানবিক করে তোলার যে সুযোগ পায়।
বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই সুযোগ ন্যূনতম পর্যায়েও নেই। ফলে এসব
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধার বিচারে নিজেদের এতটাই উচ্চাসনে
বসিয়েছে যে, অন্য পেশার মানুষদের তারা মানুষ বলেই গণ্য করতে পারছে না।
তারা ভুলে গেছে, নিজেদের কাজ বিদেশনির্ভর রেখে সাধারণ মানুষের মন জয় করা
যায় না, কিংবা গায়ের জোরে সম্মান আদায় করা যায় না।
পেশা ভিন্ন হতে পারে,
কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের সামনে কোনো পেশাই একক বা সর্বেসর্বা নয়। চিকিৎসক
কিংবা প্রকৌশলী যে-ই হোন না কেন, নিজের পেশাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে
অন্য পেশাকে ছোট করার মধ্যে শিক্ষার কোনো কৃতিত্ব নেই। নিজের অর্পিত
দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে নামের আগের পরিচয় নিয়ে লড়াই করা কোনো পেশাগত
গৌরব নয়, বরং তা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা।
নামের আগে কে কী লিখল, তার
চেয়ে বড় প্রশ্ন, নামের পর মানুষটি সমাজ ও দেশের জন্য কী রেখে গেল? শিক্ষা
যদি মানুষকে বিনয়ী, সুজন ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে না শেখায়, তবে ওই
শিক্ষার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। দিনশেষে আমাদের ডিগ্রিধারী
অহংকারী পেশাজীবী নয়, মানুষের জন্য কাজ করার মতো মানবিক পেশাজীবীই বড্ড
প্রয়োজন।
লেখক: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)।
