
গত
কিছুদিনের টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও বাতাসে অতিরিক্ত
আর্দ্রতার কারণে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের
চর্মরোগের প্রকোপ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় চিকিৎসা
কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিনই চুলকানি, দাদ, খোসপাঁচড়া, অ্যাথলেট ফুট, একজিমা ও
ছত্রাকজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
চিকিৎসকদের
মতে, বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেশি থাকায় শরীর থেকে ঘাম সহজে
শুকায় না। এই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং ভেজা জামাকাপড় ছত্রাক ( ফাঙ্গাস ) ও
ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ। এছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাবে,
বৃষ্টির জমা পানি বা জলাবদ্ধ স্থান, অপরিষ্কার পানি শরীরে লাগলে এবং
ধুলাবালি জমে ত্বকের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে চুলকানি ও ইনফেকশন দেখা দেয়।
উপজেলা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বহির্বিবিভাগ ও
জরুরি বিভাগে চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর উপস্থিতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য
হারে বেড়েছে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, সববয়সী মানুষই এসব রোগে আক্রান্ত
হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিকাজ বা বাইরে কাজ করা মানুষের মধ্যে
সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সের বহির্বিবিভাগ ও জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে তুলনামূলক
চর্মরোগ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও অন্যান্য রোগ নিয়েও এসেছেন
কেউ কেউ। এদের মধ্যে কেউ চিকিৎসা নিয়েছেন, কেউ কেউ চিকিৎসা নেওয়ার অপেক্ষায়
রয়েছেন।
উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ
হোসেন বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পায়ের আঙুলের ফাঁকে প্রচণ্ড চুলকানি ও
জ্বালাপোড়া হচ্ছে। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ ও মলম ব্যবহার করেও কোনো
আরোগ্য না পেয়ে হাসপাতালে এসেছি।
উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের বেজুরা
এলাকার বাসিন্দা রোজিনা আক্তার। তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে রিফাতকে নিয়ে
এসেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে। তাদের দুজনেরই
চর্মরোগজনিত সমস্যা। তিনি বলেন, চুলকানির সমস্যা নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছি।
ডাক্তার বলেছেন এগুলো ছত্রাকজনিত। ওষুধ লিখে দিয়েছেন।
উপজেলার চান্দলা
ইউনিয়নের বড়ধুশিয়া এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, আমার শরীরের কিছু
স্থানে গোলাকার দাগের সঙ্গে তীব্র চুলকানি। কিছুদিন নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে
বলে ওষুধ ও ক্রিম এনে ব্যবহার করেছি। প্রথমদিকে অনেকটা কমে আসলেও এখন
অনেকগুণ বেড়ে গেছে। তাই হাসপাতালে এসেছি ডাক্তার দেখাতে।
উপজেলা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. অরূপ সিংহ জানান, বর্ষাকালে বাতাসে
আর্দ্রতা বেড়ে যায়, এতে ছত্রাকও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে চর্মরোগের প্রকোপ
বেড়ে যায়। অনেকেই শুরুতে অবহেলা করেন, কেউ কেউ আবার চিকিৎসকের পরামর্শ না
নিয়েই ফার্মেসি থেকে ভুল চিকিৎসা করান। এতে সংক্রমণ আরও জটিল হয়ে পড়ে। তাই
আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শে এনে চিকিৎসা করানো জরুরি।
এ সময়টায়
চর্মরোগ থেকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে করণীয় বিষয় তুলে ধরে এই চিকিৎসক
বলেন, পা বা শরীর দীর্ঘ সময় ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে রাখা যাবে না। প্রতিদিন
নিয়মিত গোসল করতে হবে, পরিষ্কার ও শুকনো জামাকাপড় পরতে হবে। নোংরা পানি,
জলাবদ্ধ পানি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারিক জিনিসপত্র
শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার
পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শেখ হাসিবুর রেজা বলেন, বর্ষাকালে
চর্মরোগের রোগী প্রতি বছরই কিছুটা বাড়ে। এ সময়টায় উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সে আসা এ ধরনের রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র এবং
সরকারি সরবরাহ অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,
চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীরা যেন নিজ উদ্যোগে ফার্মেসি থেকে ওষুধ বা
স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম বা ওষুধ গ্রহণ বা ব্যবহার না করেন সে বিষয়ে রোগী ও
রোগীর স্বজনদের সতর্ক করা হচ্ছে। চর্মরোগের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে
দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে অথবা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ
নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং অন্যদের
মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমবে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
বজায় রাখা, শরীর ও জামাকাপড় শুকনো রাখা এবং জলাবদ্ধ বা নোংরা পানির
সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেন তিনি।
