
পরিবার,
সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতি গঠনে নারীরাই সমাজের প্রকৃত স্থপতির ভূমিকা পালন
করে। সবার জন্য বসবাসযোগ্য, শান্তিময় একটি উন্নততর বিশ্ব গড়ে তুলতে নারীর
শক্তি, সাহস ও কার্যকর অংশগ্রহণ খুবই জরুরি। পৃথিবীতে মোট নারীর সংখ্যা
প্রায় ৪০৫ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৭%। তাই, বিশ্বের তথা
যেকোনো দেশের/ জাতির উন্নয়ন সেই দেশে বসবাসকারী নারী ও মেয়েদের উন্নয়নের
সাথে সরাসরি সমানুপাতিক।
অমিত সম্ভাবনার আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের
উন্নয়নে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারীরা এক
অনিবার্য অনুষঙ্গ। পরিবারের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ছাড়াও পোশাক
শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রমে
নারীদের অবদান অপরিসীম। শিক্ষাখাতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে
বেড়েছে। ১৯৭০ এর দশকে যেখানে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হার ছেলেদের তুলনায় অনেক
কম ছিল, আজ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ও ছেলেদের সমান
বা কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। একথা অস্বীকার্য যে পোশাক শিল্পে নারী
শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ আমাদের এই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে বদলে দেয়ার
পাশাপাশি গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের লক্ষ লক্ষ নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ
খুলে দিয়েছে। পরিবার ও সমাজে তাদের নতুন ভূমিকা তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ ও
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়ন হয়েছে। তৃণমূল থেকে জাতীয়
সংসদ পর্যন্ত নারীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্ব
অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার
দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ লিঙ্গ সমতার সূচকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক
ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে ‘ভালনারেবল
উইমেন বেনিফিট’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ৪৯৩টি উপজেলার ৪৫৩৩টি ইউনিয়নে ১০
লক্ষ ৪০ হাজার অসচ্ছল নারীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল প্রদান করা হচ্ছে।
এছাড়া ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন
যত্ন থেকে শুরু করে সন্তান জন্মের পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ১০০০ দিনের
পুষ্টি, যত্ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্প নিশ্চিত করতে মাসিক ৮৫০ টাকা হারে
ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। “তথ্য আপা” প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের
তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে
তোলার কাজ চলমান রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয়
নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, অনুদান ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ
বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে নারীরা আরও সক্ষম ও আত্মনির্ভরশীল
হয়ে উঠতে পারেন। এছাড়াও নারীদের আত্মকর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য
সেলাই, ব্লক-বাটিক, কম্পিউটার ও গ্রাফিক ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান
করা হচ্ছে। নারীরা এসব প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে
আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের
প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গ্রামীণ দরিদ্র কর্মক্ষম মহিলাদের আত্ননির্ভরশীল
করে গড়ে তুলতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা, জয়িতা ফাউন্ডেশন
বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করে নারীর ভাগ্যোন্নয়নে ভূমিকা রেখে
চলেছে।
বর্তমান সরকার দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য সকল কর্মকাণ্ডে নারী
সমাজকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রায় ৪ কোটি
প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের
জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কার্য়ক্রম গ্রহণ করেছে এবং ইতোমধ্যে তা ধাপে
ধাপে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কার্ড মূলত পরিবারের নারী প্রধানদের নামে
ইস্যু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে
সরকার প্রতি মাসে ২,০০০ - ২,৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা
যথা: চাল, ডাল, তেল, লবণ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য দিবে । নারী
শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি
করা হবে। নারীদেরকে পরিবার ও সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখা হবে।
স্বাস্থ্য, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসংস্থানে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীর নেতৃত্ব বিকাশ নিশ্চিত করা হবে এবং
রাজনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা
হবে। নারীদের চলাফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার
শক্তিশালী করা, সাংস্কৃতিক বাধা দূর করা, প্রান্তিক নারীদের অন্তর্ভুক্তি
করা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার পরিসর বৃদ্ধি করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের
ঝুঁকির ক্ষেত্রে নারীর ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ
গ্রহণ করা হবে। নারীর প্রতি লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা ও বৈষম্য নিরসন করা,
নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি করা হবে। নারীর নিরাপত্তাকে
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, এসিড
নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচাররোধে কঠোর কার্যকর আইনী
ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ধর্ষক ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে
নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘নারী কল্যাণ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এসব
কেন্দ্রে নারী চিকিৎসক, আইনজীবী এবং মানবাধিকার কর্মীরা ভুক্তভোগী নারীদের
প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত সহায়তা প্রদান করবেন। স্বনির্ভরতা বাড়াতে ক্ষুদ্র,
কুটির ও মাঝারি শিল্পে যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী উদ্যোক্তাদের বিনাসুদে সুদে
ঋণের ব্যবস্থা করা ও কর-ছাড় দেয়া হবে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং
ডেভেলপমেন্ট ও মার্কেটিং সাপোর্ট প্রদান করা হবে। শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির
মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ করা হবে। নারীদের
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার মাধ্যমে পারিবারিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি ও সন্তানদের
শিক্ষা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সুগম করা সম্ভব
হবে। নারীদের কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) স্থাপন করা হবে।
গবেষণায়
দেখা যায়, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নারীরা তাদের আয়ের বড় অংশ পরিবার,
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে যা দীর্ঘমেয়াদে মানব উন্নয়নের ভিত্তি
তৈরি করে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। নারীর কর্মসংস্থান সরাসরি পরিবারের
স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করে এবং দারিদ্র্য কমেছে।
তবে এখনও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় অনেক কম, এর পাশাপাশি
কর্মক্ষেত্রে নারীরা প্রায়ই কম মজুরি পান। গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে
নারীরা শিল্পখাত ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে প্রায়শই পুরুষদের
তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম উপার্জন করেন (এই মজুরির ব্যবধান গড় ঘণ্টাপ্রতি
১৫% থেকে ৩০%-এরও বেশি)। বিভিন্ন কারনে অনেক শিক্ষিত নারী উচ্চশিক্ষা শেষ
করার পর দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছে না, ফলে তাদের দক্ষতাকে
পুরোপুরি লাগানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে নারীরা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও
পরিচর্যার কাজের পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৭.৩ গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন, এর
মূল্য দেশের জিডিপির ১৪.৮% থেকে ১৮.৯% পর্যন্ত বলে অনুমান করা হয়।
জীবনে
চলার পথে নারীরা বিভিন্ন রকমের সহিংসতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন জরিপ’-এর তথ্য
অনুযায়ী দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী তাঁদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময়
জীবনসঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার
শিকার হন। প্রতি চারজন নারীর মধ্যে অন্তত তিনজনই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির
মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল সহিংসতার নতুন
মাত্রা-অনলাইনে হুমকি, হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, ছবির অপব্যবহার, যা তরুণী ও
পেশাজীবী নারীদের প্রভাবিত করছে। বিবিএস ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের ‘নারীর
প্রতি সহিংসতা জরিপ’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী অনলাইন
সহিংসতার শিকার হন।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে
বৈষম্যকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখে মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে বিবেচনা
করতে হবে। সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে মহিলাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলধারায়
সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি । জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে এবং টেকসই উন্নয়ন
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে
স্বাবলম্বী করে তোলার বিকল্প নেই। এ সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে
নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তা কমাতে হবে।
নারীদের জন্য নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার
বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
ও গণমাধ্যমকে সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য ভূমিকা নিতে হবে। ধর্মীয় ও
সাংস্কৃতিক বোধের মর্যাদাকেও সমন্বয় করে সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে।
জাতীয় বাজেটে নারীর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো ও বরাদ্দকৃত বাজেটের কার্যকর
ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দরকার। নারীকে পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হলে
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের কর রেয়াত ও
একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
দেশের উন্নয়ন ও নারীর
ক্ষমতায়ন একটি অন্যটির পরিপূরক। নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন একটি দেশের
সার্বিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো জাতির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। নারী
অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে জাতীয় উন্নয়ন ও
সামাজিক ন্যায় অর্জন সহজতর হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীর
ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাঁদের সামগ্রিক উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণ
নিশ্চিত করা গেলে তবেই টেকসই ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠুক।
লেখকঃ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
