
গাজীউল হাসান খান ||
তৎকালীন জার আলেকজান্ডারের রাজত্বকালে নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণের প্রেক্ষাপটে কিংবদন্তি ঔপন্যাসিক লিও তলস্তয় রচনা করেছিলেন তাঁর বিশ্বখ্যাত পুস্তক ‘দ্য ওয়ার অ্যান্ড পিস’। সেটি কি ছিল একটি উপন্যাস, না ইতিহাস, একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিরাজমান রুশ সমাজের চিত্র, না অবস্থানগতভাবে মানুষের মূল্যবোধের খতিয়ান—সেই বিতর্কে যাওয়ার ক্ষমতা বা অবকাশ কোনোটিই আমার নেই। ফরাসি সমরনায়ক নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেছিলেন ১৮১২ সালে। দীর্ঘদিন চলেছিল সেই যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাঁর রচনার একটি জায়গায় তলস্তয় বলেছিলেন, ‘সব যোদ্ধার মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে দুটি বিষয়-সময় ও ধৈর্য। ’ বিশ্বব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের সেই কৌশল এখন আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে আর্থ-রাজনৈতিক কিংবা সামরিক দিক থেকে আধিপত্য বিস্তারের রণনীতি ও রণকৌশলের ক্ষেত্রে। নেপোলিয়নের সেই সমরাভিযানের প্রায় ১৩৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি রচনা করেছেন ‘সিভিলাইজেশন অন ট্রায়াল’। এতে তিনি তখনই অত্যন্ত স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আধুনিক পশ্চিমা শক্তির আবির্ভাব হয়েছে একটি নির্দিষ্ট মিশন নিয়ে, সমগ্র পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার জন্য। পুরো পৃথিবীকে তারা তাদের লক্ষ্য স্থির করবে। ’ হয়েছেও তাই। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো একটি সমঝোতা হওয়া সত্ত্বেও বাল্টিক অঞ্চল পেরিয়ে ক্রমেই পূর্ব ইউরোপের দিকে (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চল) অগ্রসর হচ্ছে। সে কারণেই জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, যা আজ এক পারমাণবিক যুদ্ধ কিংবা এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেও রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায়ও ইউক্রেন তার ‘যুদ্ধ, না শান্তি’ এই দোদুল্যমানতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ফলে ক্রমে ক্রমে ইউক্রেনে দৃশ্যতই এক ‘প্রক্সি ওয়ার’ শুরু হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা সামরিক শক্তি ন্যাটো।
রুশ-ইউক্রেন সংঘর্ষের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। কিন্তু এর মধ্যে অনুষ্ঠিত দুটি বৈঠকে গৃহীত খসড়া প্রস্তাব তৈরির পর তা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জেলেনস্কি সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়েও বারবার সেখান থেকে সরে যান। এতে কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধবিরতি হাতের নাগালে এসেও ফসকে যাচ্ছে বারবার এবং দুই পক্ষই বিভিন্ন রেঞ্জের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে একে অন্যের লক্ষ্যবস্তুর ওপর। এর পরিণতিতে ঘটেছে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ মস্কোভার ওপর হামলা। হাইপারসনিক কিংবা সুপারসনিক নয়, এমন দুটি নেপচুনের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণে ডুবে গেছে সম্ভ্রান্ত রুশ রণতরি (ফ্ল্যাগশিপ) মস্কোভা। এটি রাশিয়ার জন্য কোনোক্রমেই মর্যাদা রক্ষার লড়াই বলে বিবেচিত হতে পারে না। কারণ এর মধ্যে আরো তিনটি রুশ যুদ্ধজাহাজের সলিলসমাধি হয়েছে কৃষ্ণ সাগরের অতল গহ্বরে। বিগত দুই মাসে হাজার হাজার রুশ সেনা ও অর্ধডজন জেনারেল নিহত হয়েছেন ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে। পাঁচ দিনের মধ্যে রাজধানী কিয়েভ দখলের ঘোষণা দিয়ে ফিরে গেছে রুশ বাহিনী। এ অভিযানে বিপর্যয় ঘটেছে রুশ সেনাবাহিনীর। এ কথা ঠিক যে ইউক্রেনব্যাপী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে রুশ বাহিনী। বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিসহ গোলাবারুদের মজুদ ধ্বংস করেছে তারা। কিন্তু প্রায় দুই মাসেও নতি স্বীকার করাতে পারেনি ইউক্রেনিয়ানদের। অভিযোগ আছে যে ইউক্রেনের হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান পরিচালনা করছেন ন্যাটো সমরকুশলীরা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ বাহিনীর ইউক্রেন আক্রমণের বেশ আগে থেকেই ন্যাটোর সমরবিদরা কাজ করে যাচ্ছেন। সে কারণেই এত হামলার মুখেও মারিওপোল কিংবা দনবাসের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে সম্পূর্ণ দখলে নিতে পারছে না রাশিয়া।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউক্রেনকে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি সাহায্য দিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের নিকট প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে ইউক্রেনকে। এ কথা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে যুদ্ধবিরতি কিংবা আপস-মীমাংসা নয়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং পাল্টা আক্রমণ পরিচালনার পরামর্শই দেওয়া হচ্ছে ইউক্রেনের শাসক জেলেনস্কিকে। এতে এই সামরিক সংঘর্ষ অত্যন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই সুযোগে ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তের অর্থাৎ এককালের নিরপেক্ষ বলে পরিচিত দেশ ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে ন্যাটোভুক্ত করা হবে। এর পাশাপাশি জর্জিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং কসোভোকেও পশ্চিমা প্রভাববলয়ে টানার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এই চলমান সামরিক ও কূটনেতিক প্রক্রিয়া ইউরোপকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। এতে বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনজীবনে ক্রমে ক্রমে দুর্ভোগ নেমে আসছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য প্রায় নিয়ম করেই যেন বেড়ে চলেছে। করোনা অতিমারির কারণে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ, উৎপাদন ও বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এমন একটি অবস্থায় রুশ-ইউক্রেনের মতো সংঘর্ষ কেউ প্রত্যাশা করেনি। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের লাভ ছাড়া কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কারণ অস্ত্রের বাজার হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাজার। এখানে বছরব্যাপী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা চলে, যা অন্য কোনো উৎপাদনশীল খাতে দেখা যায় না। এখানে লক্ষণীয় যে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকে অস্ত্র কেনার জন্য অতি অল্প সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। পারমাণবিক বোমা তৈরি নিষিদ্ধ হলেও পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি বিভিন্ন কৌশলে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাশিয়ার চলমান অভিযানে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে তার সামরিক গোয়েন্দা বিভাগকে দায়ী করা হয়েছে। তা ছাড়া ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল ট্যাংকবহরসহ অবরোধ সৃষ্টি করাকে অনেকেই একটি প্রাগৈতিহাসিক রণকৌশল বলে সমালোচনা করেছেন। এ অভিযানে কমান্ডিং জেনারেলদের মধ্যে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে সর্বত্র। তা ছাড়া এ অভিযানে রাশিয়া যেসব অস্ত্রশস্ত্র কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে তার প্রায় বেশির ভাগই সোভিয়েত আমলের। আধুনিক বিমানবহর (যুদ্ধবিমান) থেকে সমরাস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র এ পর্যন্ত তেমনভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এই ‘হাফহার্টেড’ সামরিক অভিযানে রাশিয়া যে পরিমাণ সেনা সদস্য হারিয়েছে, তাতে অকল্পনীয় বলে উল্লেখ করেছেন অনেক পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষক। তা ছাড়া এ ধরনের একটি অভিযানে পাঁচ কিংবা ছয়জন জেনারেল হারানো কোনো কৃতিত্বের কথা নয়। রাশিয়ার অভিযান পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা উঠছে এখন। রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন সেনাবাহিনীর সর্বশেষ পরিকল্পনা নিয়েও বিস্তারিত তেমন কোনো তথ্য ছিল বলে অনেকে মনে করেন না। মস্কোর ধারণা ছিল, তাদের বিশাল বাহিনীর সামনে ইউক্রেনীয়রা বড়জোর পাঁচ দিনের বেশি টিকতে পারবে না। অথচ এখন প্রায় দুই মাস চলে যাচ্ছে—এ অভিযানের কোনো পরিসমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মারিওপোল ও দনবাস অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে পারলেই রাশিয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা শুরু করবেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌ ফ্ল্যাগশিপ মস্কোভার এই করুণ পরিণতি, প্রচুর যুদ্ধবিমান ধ্বংস এবং সেনা সদস্য হত্যার কারণে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী সৈনিকদের মনোবল যথেষ্ট বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যমে। এ অবস্থায় রাশিয়ার আবার নতুন করে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা কতটুকু সাফল্য বয়ে আনবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।
রাশিয়ার এই অভিযান প্রশমিত হোক, এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর অনেকেই চায়। তাদের ধারণা, এতে রাশিয়া ও তার শাসক ভ্লাদিমির পুতিন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়বে। পুতিন তাঁর নিজ দেশে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হবেন এবং রাশিয়া আরো ভেঙে গিয়ে দুর্বল হবে। সেই সুযোগে ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবির বক্তব্য অনুযায়ী আধুনিক পশ্চিমা শক্তি ক্রমে ক্রমে সারা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নিয়ে নেবে। এই ধরনের একটি পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত নয় চীনসহ বিশ্বের কিছু ভিন্ন মূল্যবোধের দেশ। তলস্তয়ের ভাষায়, সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা প্রবর্তক। যথাসময়ে কাঙ্ক্ষিত কাজটি না হলে প্রতিপক্ষ তার পূর্ণ সুযোগ নেবে, এটিই স্বাভাবিক। তারা সে জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে রয়েছে। একপক্ষীয় শক্তি সব সময়ই তাদের কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর থাকে। অথচ তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, মানবাধিকারের বুলি কপচায়। সে কারণেই বিশ্বব্যাপী প্রগতিবাদীরা বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা ও মুদ্রাব্যবস্থার কথা বলছে। তাদের পরাস্ত করতেই আধিপত্যবাদীরা ইউক্রেন যুদ্ধকে এখন দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। তারা নেহাত বাধ্য না হলে আপস-নিষ্পত্তিতে যাবে না। যুদ্ধবিরতি কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলবে না। প্রয়োজন হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বযুদ্ধ বাধাতে দ্বিধা বোধ করবে না, তবু তারা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ত্যাগ করে শান্তির পথে হাঁটবে না। তাদের গ্রাস থেকে যত তাড়াতাড়ি বিভ্রান্তি মুক্ত করে ইউক্রেনকে উদ্ধার করা যায়, ততই মঙ্গল।
লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
gaziulkhan@gmail.com