
উজান
থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা দেখা দিয়েছে। অনেক
স্থানেই হাওর রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় বাঁধ ভেঙে হাজার
হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। ফলে চরম আতঙ্কে থাকা হাওরাঞ্চলের মানুষ
দিন-রাত এক করে বাঁধ পাহারা দিচ্ছে।
স্বেচ্ছাশ্রমে ভাঙা বাঁধ মেরামত
করছে। এরই মধ্যে আধাপাকা ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। সরকারিভাবে মাইকিং করে
বলা হচ্ছে, ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই সেগুলো কেটে ফেলার জন্য। ধান কাটার জন্য
আড়াই শর মতো কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ও রিপার মেশিন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু
সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে
বহু কৃষক পরিবারের নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ হাওরে নেমে পড়েছেন ধান কাটায়। তা
সত্ত্বেও এ পর্যন্ত মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো জমির ধান কাটা গেছে।
হাওরে
আগাম বন্যার ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। তাই আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষায় বাঁধ
নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। হাওরের প্রকৃতিগত কারণেও নির্মিত বাঁধ
প্রতিবছর কমবেশি মেরামত করতে হয়। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে প্রচুর
অনিয়ম হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের তদন্তেও অভিযোগের
সত্যতা মিলেছে। এ বছরও প্রকাশিত খবরাখবরে এমন অনেক অনিয়মের অভিযোগ উঠে
এসেছে। জানা যায়, সুনামগঞ্জের শাল্লায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৭ কিলোমিটার
বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুনর্র্নিমাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৫
ডিসেম্বর থেকে। এক মাস পরেও সেখানে বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী
২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও বেশির ভাগ বাঁধের
ক্ষেত্রেই তা হয়নি। বলা হয়ে থাকে, বাঁধের কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে শুরু করা
হয়। দেরিতে কাজ শুরু হলে কাজ অর্ধেক হতে না হতেই বর্ষা এসে যায়। তখন
প্রকল্পের বাকি অর্থ লুটপাট করা যায়। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এ বছরও
সুনামগঞ্জের ৪৬টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে গৃহীত ৭০২টি প্রকল্পের
বেশির ভাগই একই পদ্ধতিতে বিলম্বিত করা হয়েছে। আর তারই খেসারত দিচ্ছেন
হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক। এতে শুধু কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না,
দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাওরে যে বছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় সেই বছর দেশেও
খাদ্যের সংকট তৈরি হয়।
প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে একই
কাহিনির পুনরাবৃত্তি ঘটে, কিন্তু তা সমাধানের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়
না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির সীমাটি কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
সে পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয় ততটুকুরই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি
হাওরাঞ্চলে থাকা নদীগুলো খননের উদ্যোগ নিতে হবে। জানা যায়, সুরমা,
কুশিয়ারা, মনু, ধলইসহ যেসব নদী দিয়ে উজানের পানি নামে, প্রায় সব নদীই ভরাট
হয়ে গেছে। ফলে ঢলের পানি নদী দিয়ে যেতে না পারায় দুকূল ছাপিয়ে ফসলি জমি
প্লাবিত করে। তার আগে এ বছর আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে
হবে।