সোমবার ● ২ নভেম্বর ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ।।
প্রকাশ: রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ০১.১১.২০২৬ ১:১৪ এএম |

 



ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশকনিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু আর বর্ষাকেন্দ্রিক রোগ নয়, বরং তা কমবেশি বছরব্যাপী বিস্তার লাভ করছে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় বছরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।...



জলবায়ু পরিবর্তনে সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পালটে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় এবার বর্ষা মৌসুমের আগেই ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। টানা বা থেমে থেমে বৃষ্টি, আর্দ্র আবহাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানি ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ। বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

মায়ের বুকের দুধে এ ভাইরাস থাকে না। কাজেই, আক্রান্ত অবস্থায় মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। তাছাড়া ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। কাজেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করলে, একই বিছানায় ঘুমালে, একই তোয়ালে, একই গ্লাস কিংবা প্লেট ব্যবহার করলে অন্যদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে সামাজিক মেলামেশায় কোনো বাধা নেই। ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ, এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। তবে ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগও থাকতে পারে, তখন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হতে পারে। অনেকে মনে করেন, ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতি করতে পারে এবং তা পরিহার করতে হবে, যা একটি ভুল ধারণা। প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগীর কোনো ক্ষতি হবে না। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ, মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই এ সময়টা ঝুঁকিপূর্ণ।

ডেঙ্গু ভাইরাস মূলত হয় দুটো প্রজাতির এডিস মশার মাধ্যমে, এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবপিকটাস নামক মশার কামড়ে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশে এবং নগর অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এডিস অ্যালবপিকটাস গ্রামগঞ্জে জঙ্গলে বাস করে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে, ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। একবার এক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তী সময় আরেকটা সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডেঙ্গু জ্বর চারবার হতে পারে। যারা একবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণের ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমানে ডেঙ্গুতে যেসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তা হলো, হঠাৎ জ্বর আসা আবার জ্বর না থাকা, কাশি, শরীর ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, অসহ্য পেটে ব্যথা, চোখে ব্যথা, ব্লাড প্রেসার ও প্রস্রাব কম হওয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, দেহে পানি আসা, পাতলা পায়খানাসহ প্লাটিলেটও অনেক কমে যাচ্ছে। জ্বরের তীব্রতা, তীব্র শরীর ব্যথা এবং র‌্যাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, ফলে রোগীরা সাধারণ জ্বর মনে করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করছেন এবং যথাযথ চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করছেন। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি হচ্ছে, কোনো কোনো রোগী হেমোরেজিক ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো মারাত্মক জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। চিকিৎসা দিতে ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভোগান্তি বাড়ছে রোগীদের।

ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এ জ্বর সাধারণত এমনিতেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাসজনিত, তাই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল খেতে পারবেন, অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। প্রচুর পানি এবং তরল খাওয়ানো উচিত। খেতে না পারলে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন বা গ্লুকোজ ইত্যাদি দেওয়া যেতে পারে। কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। যেমন–প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে, শরীরের যেকোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে। এসব ক্ষেত্রে অবহেলা না করে অবশ্যই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সবসময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে কোনো মশা কামড়াতে না পারে। কারণ, আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে এবং এভাবেই ডেঙ্গু অন্যদের মধ্যে ছড়ায়।

দু-এক দিনের জ্বরে ডেঙ্গু এনএস-১ অ্যান্টিজেন এবং চার থেকে ছয় দিন পর অ্যান্টি ডেঙ্গু অ্যান্টিবডি করা যেতে পারে। প্লাটিলেট কাউন্ট চার বা পাঁচ দিন পর কমতে শুরু করে, তাই জ্বর শুরুর চার-পাঁচ দিন পর রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। আবার অনেকেই দিনে দু-তিনবার, এমনকি একই সঙ্গে একাধিক ল্যাবরেটরি থেকে প্লাটিলেট কাউন্ট করে থাকেন, যা অপ্রয়োজনীয়। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার হলেই রোগী এবং চিকিৎসক উভয়েই রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ যদি রক্তক্ষরণ না হয় এবং রোগীর রক্তের হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকে, তবে রক্ত পরিসঞ্চালন করার কোনো প্রয়োজন নেই। ডেঙ্গু জ্বরের চার বা পাঁচ দিন পরে প্লাটিলেট কমতে থাকে, দু-তিন দিন পর তা বাড়তে শুরু করে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের কোনো প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় প্লাটিলেট একটু কমে গেলেই রোগী এবং চিকিৎসক প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন প্রজাতি বা সেরোটাইপ আছে, তাই চারবার ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো একটি প্রজাতি দ্বারা একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ভবিষ্যতে সেই সেরোটাইপ দ্বারা আর আক্রান্ত হয় না। কারণ শুধু সেই সেরোটাইপটিতে রোগীর আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। কিন্তু বাকি তিনটি প্রজাতি দ্বারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ঠিকই রয়ে যায়। তবে কেউ যদি পৃথকভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রজাতি দ্বারা জীবনে চারবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে বাকি জীবনে আর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে: ১. এডিস মশা মেরে ফেলা এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা। ২. মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরের বাহক, ডেঙ্গু জ্বর হয়তো নির্মূল করা যাবে না, এর কোনো ভ্যাকসিন কিংবা কার্যকর ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ডেঙ্গুর মশা আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে মুক্তি সম্ভব। যেহেতু এডিস মশা একটি গৃহপালিত মশা, তাই কেবল প্রশাসনের পক্ষে এডিস মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। যার যার বাড়ি এবং আঙিনা নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা খুবই জরুরি। ঘরের বাইরের পরিষ্কার-পরিচ্ছতা প্রশাসনের দায়িত্ব। এ ছাড়া কিছু কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ যেমন মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, প্রজনন স্থল শনাক্তকরণ ও ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন এবং জনসাধারণকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে সবাইকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাও যেমন নেই, তেমনি কার্যকর প্রতিষেধক কোনো ভ্যাকসিন নেই। তাই একমাত্র প্রতিরোধই হতে পারে ডেঙ্গু জ্বর বিস্তারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। আর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এ মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশকনিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু আর বর্ষাকেন্দ্রিক রোগ নয়, বরং তা কমবেশি বছরব্যাপী বিস্তার লাভ করছে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় বছরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২