মাসুমুর রহমান মাসুদ ।।
১.
বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) এমন এক কবি যাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসর ধর্ম, প্রেম, মানবতা, বিদ্রোহ ও আধ্যাত্মিকতার বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে যুক্ত করেছে। তিনি একাধারে বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি, গভীর ধর্মানুভূতি ও মরমি চেতনার কবি। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে ইসলামী ঐতিহ্যের যে বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত ও গজল। নজরুলের ইসলামী গানকে কেবল ধর্মীয় অনুষঙ্গের গান হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। এসব গানের মধ্যে আল্লাহর প্রতি প্রেম, রাসুলপ্রেম, আত্মসমর্পণ, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, বিরহ, মুর্শিদের সন্ধান এবং মানবাত্মার পরিশুদ্ধির যে আকাক্সক্ষা প্রকাশিত হয়েছে, তার সঙ্গে সুফি দর্শনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও নজরুলের কবিতা ও গানে ঐশী প্রেম এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সঙ্গে সুফিবাদী ঐতিহ্যের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
২.
এই আলোচনার গভীরে যাওয়ার পূর্বে সুফী ও সুফীবাদ নিয়ে কিছু কথা বলে রাখা ভালো। ‘‘সুফী’’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ‘‘আসহাবে সুফফা’’ থেকে সুফী শব্দের উৎপত্তি। বারান্দায় বসে ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিকে বুঝাতে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উন্নত চরিত্র এবং পবিত্রতার গুজাধারী কিছু সাহাবা মসজিদে সর্বদা ইবাদতরত থাকতেন। তাঁরাই সুফীতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। ইসলামের জন্মলগ্নের প্রথম দিকের মুসলমান, যারা রাসূল (সা.)-এর সাথে সর্বদা থাকতেন, তাঁদেরকে ‘আসহাবে সুফফা’ বলা হয়। আবার ‘সুফ’ বা পশমী কাপড় পরিধানকারী ব্যক্তিকে বুঝাতে এই শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। কারণ সুফীরা ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন-যাপনকারীদের প্রতীক। তবে ‘আসহাবে সুফফা’ থেকে শব্দটির উৎপত্তির বিষয়টি বেশী গ্রহণযোগ্য বলে অনেকে মনে করেন। ঠিক একইভাবে সুফীবাদের সংজ্ঞা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ‘আল্লাহর সত্তার উপলব্ধিই হল তাসাউফ’। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, ‘ইন্দ্রিয়জ আত্মার সব প্রবৃত্তির বিসর্জনই সুফীবাদ’।
যাহোক, অন্তরের বিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে জীবনের পূর্ণ বিকাশ সাধন করে আল্লাহর সত্তার উপলব্ধিই হলো সুফীবাদের মূল লক্ষ্য। সুফীরা ছিলেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী এবং পূত পবিত্র। কোরআনের সঠিক শিক্ষা এবং রাসূল (সা.)-এর সরাসরি সাহচর্য গ্রহণ করে তাঁরা অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বর্জন করে তাঁরা যিকির-ফিকির ও মোরাকাবা-মোশাহেদায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। সর্বোপরি, রাসূল (সা.)-এর সাথে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে তাঁরা অনেক রহস্যময় বিষয়ের জ্ঞান লাভ করতেন। যার কারণে জাগতিক বিষয়াবলী তাঁদের নিকট তুচ্ছ মনে হত। এই আসহাবে সুফফাদের মধ্যে ইসলামের চার খলিফা ছাড়াও হযরত সালমান ফারসী (রা.), হযরত আবুজর গিফারী (রা.), হযরত আবু হোরায়রা (রা.), হযরত মিকদাছ (রা.), হযরত মায়াজ (রা.) প্রমুখ সাহাবীদের নাম উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে বেশীরভাগ সাহাবী ইসলামের জন্য ধন-মন-জন উৎসর্গ করেন। সাথে সাথে তাঁরা এমন অনাড়ম্বর জীবন-যাপন করতেন যে বস্ত্রাভাবে তাঁদের পশমী কম্বল পরিধান করতে হতো।
৩.
এসব আলোচনা থেকে বলা যায়, সুফিবাদ ইসলামের অন্তর্মুখী ও আধ্যাত্মিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এর কেন্দ্রে রয়েছে আল্লাহর প্রেম, আত্মশুদ্ধি, অহংবোধের বিলোপ, স্রষ্টার নৈকট্য লাভ এবং মানবপ্রেমের মধ্য দিয়ে পরম সত্যের সন্ধান। ফারসি ও উর্দু সাহিত্যে হাফিজ, শেখ সাদি, জালাল উদ্দিন রুমি, আমির খুসরো প্রমুখ কবির রচনায় এই মরমি প্রেম নানা প্রতীকে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা ভাষায় সুফি, মরমি, বাউল ও ফকিরি গানের ঐতিহ্যের সঙ্গে হামদ-নাত ও ইসলামী আধ্যাত্মিক সংগীতেরও দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলার হামদ-নাতের ঐতিহ্যে সুফি কবিদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পরবর্তী সময়ে এই ঐতিহ্য গজল ও কাওয়ালির মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ভুবনকে সমৃদ্ধ করে। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার গ্রহণ করেও নজরুল নিছক অনুকরণ করেননি। তিনি আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দভাণ্ডার, ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ভারতীয় রাগসংগীত, লোকসুর, গজলের কাঠামো এবং বাংলা কাব্যভাষাকে একত্রিত করে ইসলামী সংগীতের একটি আধুনিক বাংলা রূপ নির্মাণ করেন। তাঁর গজল বাংলা গানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক সৃষ্টি করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি পারস্যের গজল-ধারাকে বাংলা গানের সঙ্গে যুক্ত করে ভারতীয় ও পারস্য সুরের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
৪. সুফিবাদ ও নজরুলের আধ্যাত্মিক চেতনা
নজরুলের ইসলামী সংগীতের অন্তর্গত প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আবেগ হলো প্রেম। এই প্রেম কেবল পার্থিব প্রেম নয়, এর একটি বড় অংশ আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি নিবেদিত প্রেম। কোথাও কোথাও জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সম্পর্ক অনুসন্ধানের নিগূঢ় চেষ্টা বিশেষ লক্ষ্যণীয়। সুফি সাহিত্যে ‘ইশক’ বা প্রেমকে মানুষের আত্মিক উত্তরণের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ তার সীমাবদ্ধ সত্তাকে অতিক্রম করে পরম সত্তার দিকে এগিয়ে যায় একমাত্র প্রেমের মাধ্যমে। এই প্রেমের রহস্য মানব-মানবীর শরীরী প্রেমের স্কেলে পরিমাপযোগ্য নয়। আত্মিক বিশুদ্ধতার সমৃদ্ধি দিয়ে এই প্রেমের পথে হাটতে হয়। নজরুলের হামদ, নাত ও ইসলামী গজলে এই প্রেম কখনো প্রার্থনা, কখনো আকুতি, কখনো আত্মসমর্পণ এবং কখনো বিরহের রূপ ধারণ করেছে। তাঁর বিখ্যাত হামদে উচ্চারিত হয়েছে-
আল্লাহ্ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।/
আমার নবি মোহাম্মদ, যাঁহার তারিফ জগৎময়॥/
আমার কীসের শঙ্কা, কোরআন আমার ডঙ্কা,/
ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়॥/
প্রথম চরণের এই সংক্ষিপ্ত উচ্চারণের মধ্যেই বিশ্বাস, নির্ভরতা ও আত্মসমর্পণের এক গভীর অনুভূতি নিহিত। এখানে আল্লাহ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে স্রষ্টা নন। তিনি কবির আশ্রয়, শক্তি ও নির্ভয়ের উৎস। সুফি ভাবধারায় মুরিদ যখন নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে পরম সত্তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়, তখন তার মধ্যে যে তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতার অনুভূতি জন্ম নেয়। নজরুলের এই উচ্চারণে তারই কাব্যিক প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর ইসলামী সংগীতে আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাই কেবল আনুষ্ঠানিক উপাসনার সম্পর্ক নয়, অন্তরঙ্গ আত্মিক সম্পর্ক। নজরুলের আরেকটি গানে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে স্রষ্টার সৌন্দর্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি লিখেছেন-
ফুলে পুছিনু, বল, বল ওরে ফুল!/
কোথা পেলি এ সুরভি, রূপ এ অতুল?/
যার রূপে উজালা দুনিয়া, কহে গুল,/
দিল সেই মোরে এ রূপ এ খোশবু।/
আল্লাহু আল্লাহু!/
এরপর ফুলের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে স্রষ্টার সৌন্দর্যের সন্ধান করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সুফি কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পরের স্তবকে তিনি কোকিল, পাপিয়া কে প্রশ্ন করেছেন এ সুর, মধুর কণ্ঠ কে তাকে দান করলো ? সূর্য, চন্দ্রকে প্রশ্ন করেছেন তারা কোথায় এমন আলোর জ্যোতি পেলো ? এরপর তিনি আল্লাহ্র রূপের প্রশংসা করেন যে রূপ দর্শনের পূর্বেই হযরত মূসা (আ.) বেহুঁশ হয়েছিলেন। সুফি কবির কাছে প্রকৃতি কেবল বস্তুজগত নয়। দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে অদৃশ্য পরম সৌন্দর্যের ইশারা থাকে। ফুলের সৌরভ, চাঁদের আলো, বসন্তের রূপ কিংবা মানুষের হৃদয়ের প্রেম- সবই পরম সৌন্দর্যের প্রতিফলন হতে পারে। ফলে নজরুলের প্রকৃতি-চেতনা তাঁর ইসলামী গানে আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। তাঁর হামদে সৃষ্টিজগত হয়ে উঠেছে স্রষ্টাকে চেনার একটি মাধ্যম। এই ধরনের ভাবপ্রবণতার উদাহরণ নজরুলের হামদ-নাতের আলোচনায়ও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. হামদে সুফি ভাবধারার প্রকাশ
হামদ হলো আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশের সংগীত। বাংলা ভাষায় হামদ-রচনার একটি শক্তিশালী আধুনিক ধারা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নজরুলের ভূমিকা অসাধারণ। তাঁর হামদে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে হৃদয়গ্রাহী মরমি আবেদন। আল্লাহ তাঁর কাছে দূরবর্তী কোনো বিমূর্ত সত্তা নন। তিনি মানুষের দুঃখে আশ্রয়দাতা, বিপদে রক্ষাকারী এবং অন্তরের আকাক্সক্ষার পরিপূরক। “তুমি অনেক দিলে খোদা দিলে অশেষ নিয়ামত”, “তুমি আশা পুরাও খোদা সবাই যখন নিরাশ করে” কিংবা “তোমারি মহিমা সব বিশ্বপালক কর্তার”- এ জাতীয় পংক্তিতে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, নির্ভরতা ও ভক্তির যে প্রকাশ ঘটে, তা ইসলামী বিশ্বাসের পাশাপাশি সুফি মরমি চেতনার সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। নজরুলের হামদের বিষয়বস্তুতে আল্লাহর মহিমা, দয়া, নিয়ামত, ক্ষমা এবং মানুষের অসহায়ত্ব বারবার ফিরে আসে। সুফি দর্শনে মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা। মানুষ যত বেশি নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে, তত বেশি সে স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা অনুভব করে। নজরুলের হামদে এই আত্মসচেতনতা আছে। তাঁর কবিসত্তা এখানে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়কে গ্রহণ করে। বিদ্রোহী কবির কণ্ঠ যখন হামদে পরিণত হয়, তখন বিদ্রোহের শক্তি বিনষ্ট হয় না। তা অন্যায়, অহংকার ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে নৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৬. নাতে রাসুলে প্রেম ও মরমি আকুতি
নজরুলের নাত-রচনায় সুফি প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায় রাসুলপ্রেমের প্রকাশে। নাতের মূল বিষয় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রশংসা ও গুণকীর্তন। নজরুলের নাত শুধু প্রশস্তিমূলক কবিতা নয়- এগুলোতে রাসুলের প্রতি প্রেম, মদিনার প্রতি আকর্ষণ, নবীজির সান্নিধ্য লাভের আকাক্সক্ষা এবং আত্মিক আশ্রয়ের আবেদন একত্রিত হয়েছে। নজরুলের নাতে রাসুলপ্রেম অনেক সময় বিরহের ভাষা ধারণ করে। সুফি সাহিত্যে বিরহ বা ‘ফিরাক’ এবং মিলন বা ‘ওসাল’ আধ্যাত্মিক প্রেমের গুরুত্বপূর্ণ রূপক। প্রিয়তমের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের আকাক্সক্ষা মানুষের আত্মিক যাত্রাকে তীব্র করে। নজরুল যখন মদিনার পথে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেন, তখন সেই আকাক্সক্ষা কেবল ভৌগোলিক ভ্রমণের আকাক্সক্ষা থাকে না। তা হয়ে ওঠে আত্মার প্রিয়তমের কাছে প্রত্যাবর্তনের আকুতি। নবীজির ধরায় আগমনকে কবি এক অপার্থিব আনন্দের ঘটনা হিসেবে কল্পনা করেছেন-
তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।/
এখানে নবীজির আগমনের সঙ্গে চাঁদ, পূর্ণিমা, আলো ও সৌন্দর্যের চিত্রকল্প যুক্ত হয়েছে। এই আলোক-প্রতীক সুফি কাব্যধারায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নূর’ বা ঐশী আলো ইসলামী আধ্যাত্মিকতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নজরুলের নাতে নবীজির আগমনকে আলো ও সৌন্দর্যের বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যে সেই মরমি কল্পনার সৃজনশীল প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।
৭. গজলে সুফি প্রভাব
নজরুলের গজল বাংলা সাহিত্যে ও সংগীতে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। গজলের উৎস আরবি-ফারসি-উর্দু সাহিত্যধারায় হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এটি বহুমাত্রিক রূপ লাভ করে। প্রেম, বিরহ, সৌন্দর্য, মদ, সাকি, মেহফিল, প্রিয়তম এবং বিচ্ছেদের মতো প্রতীক গজলের ভাষায় বহুল ব্যবহৃত। সুফি কবিরা এসব প্রতীককে পার্থিব অর্থের বাইরে নিয়ে গিয়ে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য প্রদান করেছেন। ‘মদ’ হয়ে উঠেছে ঐশী প্রেমের নেশা, ‘সাকি’ কখনো পরম সত্তার অনুগ্রহের প্রতীক, আর ‘প্রিয়তম’ হয়ে উঠেছে আল্লাহ বা পরম সত্যের প্রতীক। নজরুলের গজলেও প্রেমের এই দ্বৈত ও বহুমাত্রিক অর্থ দেখা যায়। নজরুল বাংলা ভাষায় গজলকে জনপ্রিয় ও স্বতন্ত্র সংগীতধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর গজলে পারস্যের প্রেমকাব্যের সঙ্গে ভারতীয় সংগীতরীতির সমন্বয় ঘটেছে। তাঁর ইসলামী গজলের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ-
খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে/
হই মাতোয়ারা।/
এখানে ‘শরাব’ শব্দটি সরাসরি মদ্যপানের অর্থে না নিয়ে সুফি প্রতীকের আলোকে পাঠ করলে তা ঐশী প্রেমের নেশার প্রতীক হিসেবে ধরা পড়ে। পারস্যের সুফি কাব্যে ‘মদ’ ও ‘মাতাল’ হওয়া বহুবার আত্মবিস্মৃত ঐশী প্রেমের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুল সেই প্রতীকী ঐতিহ্যকে বাংলা গজলে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কাছে খোদার প্রেম এমন এক শক্তি, যা মানুষকে জাগতিক সংকীর্ণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করিয়ে বৃহত্তর আধ্যাত্মিকতার দিকে নিয়ে যায়। জাগতিক লোভ-লালসাকে তুচ্ছ মনে হয়। ইহলৌকিক কামনা-বাসনা তখন আর তাকে গ্রাস করতে পারে না। এই প্রতীকী ভাষা নজরুলের গজলকে সরল ধর্মীয় সংগীতের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে। তাঁর গজলে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার শুধু ভাষার অলংকার নয়, এগুলো একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক আবহ নির্মাণ করে। ‘খোদা’, ‘দিল’, ‘ইশক’, ‘শরাব’, ‘মদিনা’, ‘কাবা’, ‘নবী’, ‘মুর্শিদ’ প্রভৃতি শব্দের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার মধ্যে ফারসি-উর্দু ইসলামী কাব্যভাষার একটি নতুন পরিসর সৃষ্টি করেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।
৮. মুর্শিদ, আত্মসমর্পণ ও আত্মশুদ্ধি
সুফি সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো মুর্শিদ। মুর্শিদ আধ্যাত্মিক পথের পথপ্রদর্শক। মানুষের আত্মিক যাত্রায় তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়ার সহায়ক। নজরুলের ইসলামী সংগীতে মুর্শিদি ও মারফতি ভাবের উপস্থিতি তাঁর সুফি ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলার লোকসংগীত, বাউল, ফকিরি, মুর্শিদি ও মারফতি গানের মধ্যে যে মরমি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, নজরুল তার সঙ্গে ইসলামী গজল ও আধুনিক সংগীতের সৃজনশীল সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তাঁর ইসলামী গানের সঙ্গে বাউল, ফকিরি, মুর্শিদি ও মারফতি ধারার সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, তুরস্ক ও ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এই জায়গায় নজরুলের মৌলিকত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সুফিবাদকে কোনো গূঢ় তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রেম, প্রার্থনা, সঙ্গীত ও মানবিক আবেগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর ইসলামী গান একই সঙ্গে ধর্মীয়, কাব্যিক ও সংগীতনির্ভর। ফলে একজন সাধারণ শ্রোতা যেমন গানটি ভক্তির গান হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তেমনি একজন সাহিত্যপাঠক তার মধ্যে প্রতীক, রূপক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা আবিষ্কার করতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন-
তাওহীদেরই মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের নাম/
মুর্শিদ, মুহাম্মদের নাম!/
ওই নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম/
মুর্শিদ, মুহাম্মদের নাম!/
ওই নামেরই রশি ধরে যাই আল্লাহর পথে,/
ওই নামেরই ভেলায় চড়ে ভাসি নূরের স্রোতে,/
ওই নামের বাতি জ্বেলে দেখি আরশের মোকাম।/
মুর্শিদ, মুহাম্মদের নাম!
৯. প্রেম, বিরহ, লোক ঐতিহ্য ও সুফি প্রতীকের ব্যবহার
নজরুলের গজলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রেমের বহুমাত্রিকতা। তাঁর প্রেমের গান কখনো মানবপ্রেম, কখনো প্রকৃতিপ্রেম, কখনো ইসলামী ভক্তি এবং কখনো ঐশী প্রেমের ভাষা ধারণ করে। সুফি কাব্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পার্থিব প্রেম ও ঐশী প্রেমের মধ্যে একটি প্রতীকী সেতু তৈরি করা। নজরুলের গজলে সেই ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে। ‘দিল’ বা হৃদয় তাঁর গানে শুধু অনুভূতির কেন্দ্র নয়, এটি আত্মার প্রতীক। ‘ব্যথা’ শুধু পার্থিব দুঃখ নয়, তা হতে পারে প্রিয়তমের বিচ্ছেদের আধ্যাত্মিক বেদনা। ‘মিলন’ কেবল মানবপ্রেমের পরিণতি নয়, তা হতে পারে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের প্রতীক। এই কারণেই নজরুলের গজলকে শুধু ধর্মীয় গান বা প্রেমের গান- কোনো একক শ্রেণিতে আবদ্ধ করা যায় না। নজরুলের ইসলামী সংগীতের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো লোকসংগীত ও সুফি ঐতিহ্যের সমন্বয়। বাংলা অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সুফি সাধক, পীর-ফকির এবং মরমি গানের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। পুঁথি, জারি, মারফতি, মুর্শিদি, বাউল ও ফকিরি গানের ভাষায় ইসলামী আধ্যাত্মিকতার যে লোকায়ত রূপ গড়ে উঠেছিল, নজরুল তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং সেখান থেকে উপাদান গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কিছু ইসলামী গান লোকসুরের প্রভাব বহন করে। আবার কিছু গানে রাগসংগীতের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। “ওরে ও দরিয়ার মাঝি”, “পুবান হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া”, “এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি” এসব গানে লোকজ সুর ও ইসলামী অনুভূতির সমন্বয় দেখা যায়। অন্যদিকে “মোহররমের চাঁদ এল ঐ”, “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে”, “খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে”, “বক্ষে আমার কাবার ছবি”, “যাবি কে মদিনায়” - প্রভৃতি গানে রাগসংগীতের সুররীতি ও ইসলামী আবেগের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়।
এই সমন্বয় নজরুলের ইসলামী সংগীতকে অভিজাত সাহিত্য বা ধর্মীয় আচারসর্বস্বতার গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের শ্রুতির জগতে পৌঁছে দেয়। সুফিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও হলো মানুষের হৃদয়ের ভাষায় আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করা। নজরুল সেই কাজটি করেছেন বাংলা গান ও কাব্যের আধুনিক ভাষায়। নজরুলের সুফি চেতনা কেবল ব্যক্তিগত ধর্মানুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এসবের মধ্যে মানবতাবাদী দর্শনেরও সংযুক্তি ঘটেঠেছ। সুফি দর্শনে মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের প্রতি ঘৃণা রেখে আল্লাহর প্রেম দাবি করা যায় না- এই অন্তর্নিহিত মানবিক বোধ নজরুলের সামগ্রিক সাহিত্যদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এসব কারণেই তাঁর ইসলামী সংগীত সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভাষা হয়ে ওঠেনি। তিনি যেমন আল্লাহ ও রাসুলের প্রশংসা করেছেন, তেমনি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়েও অসংখ্য গান লিখেছেন। তাঁর শ্যামাসংগীত, ভজন, ইসলামী গান ও গজল পরস্পরকে অস্বীকার না করে তাঁর বৃহত্তর মানবতাবাদী সত্তার বিভিন্ন প্রকাশ হয়ে উঠেছে। তাই নজরুলের সুফিবাদী চেতনাকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর শিল্পসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়। তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির উপাদান নয়। সত্য, প্রেম ও ন্যায়ের দিকে অগ্রসর হওয়ারও শক্তি। ইসলামী সংগীতে এই চেতনা কখনো আল্লাহর প্রেমে, কখনো রাসুলের প্রতি ভক্তিতে, কখনো মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষায় এবং কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে প্রকাশ পেয়েছে।
১০. ভাষা ও সুরে সুফি ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ
নজরুলের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এই যে তিনি প্রাচীন ইসলামী ও সুফি ঐতিহ্যকে আধুনিক বাংলা সংগীতের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর শব্দভাণ্ডারে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের পাশাপাশি দেশজ বাংলা শব্দের ব্যবহার রয়েছে। ফলে তাঁর গানে ইসলামী ঐতিহ্য যেমন অক্ষুণ্ন থাকে, তেমনি বাংলা ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্যও বজায় থাকে। তাঁর সংগীতের সুরেও একই ধরনের বহুমাত্রিকতা রয়েছে- ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, বাংলা লোকসংগীত, গজল, কাওয়ালি, ঠুংরি প্রভৃতি বিভিন্ন রীতির সৃজনশীল সংমিশ্রণ ঘটেছে। নজরুলের ইসলামী গান ও গজল নিয়ে আলোচনায় এই বহুসাংস্কৃতিক সুরসমন্বয়কে তাঁর অন্যতম স্বাতন্ত্র্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর গজলের সুরে তাল ও ছন্দের ব্যবহারেরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নজরুল গজলের মুক্ত সুরবিহারকে তাল ও ছন্দের কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করে বাংলা গজলকে স্বতন্ত্র সংগীতরূপ দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর গজল শুধু ফারসি বা উর্দু গজলের অনুবর্তী হয়নি- বাংলা ভাষা ও ভারতীয় সংগীতের নিজস্ব রসায়নে তা নতুন জীবন লাভ করেছে।
১১. নজরুলের মৌলিকত্ব
নজরুলের আগে বাংলায় ইসলামী ভাবধারার গান ও কাব্য ছিল না- এমন দাবি করা হলে ঐতিহাসিকভাবে তা সঠিক হবে না। বাংলা অঞ্চলে পুঁথি, জারি, মুর্শিদি, মারফতি ও সুফি-মরমি গানের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু নজরুলের বিশেষত্ব হলো তিনি এই বিচ্ছিন্ন ঐতিহ্যগুলোকে আধুনিক সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী সৃজনধারা নির্মাণ করেন। তাঁর ইসলামী সংগীত একই সঙ্গে শাস্ত্রীয়, লোকজ, পারস্য-উর্দু গজলধর্মী এবং আধুনিক বাংলা গানের বৈশিষ্ট্য বহন করে। তাঁর সৃষ্টির ফলে হামদ-নাত কেবল ধর্মীয় পরিবেশনার বিষয় থাকেনি; বাংলা আধুনিক সংগীতেরও অংশ হয়ে উঠেছে। একইভাবে গজল বাংলা গানের জনপ্রিয় ধারায় প্রবেশ করেছে। এই দিক থেকে নজরুলের অবদান শুধু সাহিত্যিক নয়, সাংস্কৃতিকও। তিনি বাংলা মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতিকে আধুনিক শিল্পরূপ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর গান বাংলা ভাষাভাষী বৃহত্তর সমাজের জন্যও উন্মুক্ত থেকেছে।
এভাবে কাজী নজরুল ইসলামের হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত ও গজল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুফিবাদ তাঁর সৃষ্টির ওপর সরাসরি কোনো একরৈখিক প্রভাব বিস্তার করেনি। সুফি ঐতিহ্যের প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ, আত্মশুদ্ধি, ঐশী সৌন্দর্যের সন্ধান এবং মানবপ্রেম তাঁর নিজস্ব কবিসত্তার সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ লাভ করেছে। তাঁর হামদে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও প্রেম, নাতে রাসুলের প্রতি গভীর আকুলতা, গজলে ঐশী প্রেমের প্রতীকী ভাষা এবং ইসলামী সংগীতে আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার আহ্বান- সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত মরমি জগৎ নির্মিত হয়েছে।
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক, কবি ও প্রাবন্ধিক।
মোবাইল: ০১৮১৮৫৯৯১৯৯
