শুক্রবার ● ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
ক্লাইমেট স্ট্রাইক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ৩০.১০.২০২৬ ১:২৬ এএম |

ক্লাইমেট স্ট্রাইকঅধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ।।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গ্রিন দলগুলির রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ খুবই স্পষ্ট। এমনকি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পার্লামেন্টে এদের প্রতিনিধিত্ব চোখে পড়ার মত। ইইউ’র একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ জার্মানিতে গ্রিন পার্টি এখন ক্ষমতার এক বিরাট অংশ। জার্মানির গ্রিন পার্টির নেতাদের অভিমতে দেখা যায় যে, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এদের জোরালো বক্তব্য থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে, বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তনই যে একমাত্র পথ তা তারা স্বীকার করে না। এমন একটা অবস্থায় নবীন প্রজন্মের সামনে ‘ফ্রাইডেইজ ফর ফিউচার’ এর শ্রেণি আন্দোলন এবং পুঁজিতন্ত্রের অবসানের ডাক এ আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছে যার রূপটি হচ্ছে ক্লাইমেন্ট স্ট্রাইক।
একটি দেশে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ তার উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। শক্তি উৎপাদনের উৎস হল প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার শক্তি উৎপাদনের সময় জ¦ালানি ব্যবহার হলে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। উন্নয়নশীল দেশে জীবাশ্ম জ¦ালানির উৎসের উপর অধিক নির্ভরশীল তাই বাস্তব। ঐতিহাসিক কার্বন নির্গমন এর তথ্য বলছে যে, শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই আজকের দুনিয়ার উন্নত দেশগুলি খনিজ জ¦ালানির যথেচ্ছ ব্যবহার করে এ গ্রহের কার্বন স্পেসের অধিকাংশটাই দখল করে নিয়েছে এটা ঠিক যে, সে সময় বিশ^ উষ্ণায়ন সম্পর্কে ধারণা এবং সচেতনতা দানা বাঁধেনি। কার্বন স্পেস মানে সর্বাধিক যতটা কার্বন পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ধারণ করলে জীবকুল বাঁচতে পারে। কার্বন স্পেস এর অধিকার থেকেই শুরু বিশ^ পরিবেশ রাজনীতি। দক্ষিণের দেশগুলো যে লড়াই ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আমেরিকা, চীন ইত্যাদির নেতৃত্বে করতে পারত তা করতে আপারগ হয়েছে। ফলে উন্নত দেশগুলি কার্বন স্পেস এর উপর তাদের প্রভুত্ব সমানে বজায় রেখেছে।
কোন একটি দেশে কার্বন নির্গমনের আধিক্যের কারণে সেই দেশ তার উৎপাদক সংস্থাকে কার্বন শোষণের ব্যবস্থা নিতে বলে। কিন্তু কর্পোরেট সংস্থাগুলি সাধারণভাবে কার্বন শোষণের ব্যবস্থার দায়িত্ব না নিয়ে বায়ুমন্ডলে জমে থাকা কার্বন বিক্রি করে দিতে চায়। কার্বন শোষণের সবচেয়ে সস্তা এবং সহজ উপায় হল অরণ্য সংরক্ষণ এবং নিদেন পক্ষে বৃক্ষরোপন। কিন্তু এর জন্য চাই জমি, উন্নয়নশীল দেশে যদি সরকার কর্পোরেট বান্ধব হয় তাহলে তো কথাই নেই। জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে কার্বন অফসেট (ড়ভভংবঃ)বা ক্ষতিপূরণ বানিজ্যিকভাবে সহজ পদ্ধতি। একটি দেশের পণ্য উৎপাদনকারী কোন কর্পোরেট সংস্থা অন্য একটি দেশের বা সেই দেশের অন্য কোন স্থানে অরণ্য সৃজন বা প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া অরণ্য সংরক্ষনের জন্য কার্বন বিক্রি করতে পারে। একেই কার্বন অফসেট বলা হয়। এ দেয়া-নেয়া ঘটে অর্থের মাধ্যমে। এ বিনিময়কে কার্বন বানিজ্য বলা হয়। আসলে এ হল আন্তর্জাতিক অরণ্য পরিচালন নীতির বা নিয়ন্ত্রণের আরেক নাম। ভারতের মত একটি দেশ, যেখানে শিল্প উৎপাদন অনেকটা বাম এবং ২৩ ভাগ অরণ্য ও বেশ কিছু পতিত জমি রয়েছে, সেখানে কার্বন শোষণের জন্য বানিজ্যের ব্যবস্থাপনাকে পূঁজিতন্ত্র উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর বলে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এখানে চরম বিপদের মুখে চলে যায় অরণ্য ও অরণ্যবাসীরা।
সুইডেনের তরুনী গ্রেটা থুনবার্গ বিশ^জুড়ে বেশ কয়েক বছর ধরে স্টকহোমে পার্লামেন্টের সামনে বিশ^ উষ্ণায়নের মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারগুলির নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদ করতে করতে বিশে^র অন্যতম প্রতিবাদী কন্ঠ হয়ে উঠে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সভায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট নায়কদের সামনে গ্রেটার দাবী ছিল বিশ^ উষ্ণায়নরোধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। এ সময় থেকেই শুরু হয় ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’। টঘঊচ বলছে যে, এ আন্দোলন সারা বিশে^র ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে এক অনুপ্রেরণা। জলবায়ু পবির্তনে উত্তর দক্ষিণের বৈষম্য স্পষ্ট। ১৯৯৭ সনে কিয়াটো চুক্তির সিদ্ধান্ত মতে শিল্পোন্নত দেশগুলিকে বর্তমানের নির্গমন কমানোর উপর জোর দিতে বলা হয়। কিয়াটো চুক্তি অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয় তাতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ইজরায়েলসহ মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ সাড়া দেয়নি। ফলে পৃথিবীর কার্বন স্পেস উন্নত দেশগুলোর দ্বারাই পূরণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে এ দাবী তুলতে না পারলে সর্বনাশ আসন্ন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত বায়ুমন্ডলে ৪০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা তার সমতুল্য গ্যাস জমা করছে। ভারতবর্ষে এ পরিমাণ ৫ কোটি টনেরও কম। বর্তমানে বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু নির্গমন প্রায় ১৬ টন। অথচ ভারতে মাথাপিছু নির্গমন ১ থেকে ১.৫ টন।
ফ্রাইডেইজ ফর ফিউচার বলেছে, পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ পুঁজিপতি মুনাফার লোভে পরিবেশ ধ্বংসের খেলায় মেতেছে। তাদের মুনাফা হল আমাদের যন্ত্রণা এবং মৃত্যু। প্রতিবছর ক্লাইমেট স্ট্রাইকের ডাক দিচ্ছে ‘ফ্রাইডেইজ ফর ফিউচার’। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় শুক্রবার এ ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। অবশ্য কেবল ‘ফ্রাইডেইজ ফর ফিউচার’ নয়, কিশোর ও যুবকদের এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের অসংখ্য সংগঠন এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিবাদী এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ২০২২ সালে জলবায়ু ধর্মঘটের শ্লোগান ছিল “চবড়ঢ়ষব হড়ঃ চৎড়ভরঃ” অর্থাৎ “মুনাফা নয়, মানুষই শেষ কথা।” কর্পোরেট কেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, সেই ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা ছিল এ আহ্বানে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২