প্রদীপ মজুমদার ।।
কুমিল্লার লালমাই উপজেলা নির্বাচন অফিসে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি, তথ্য সংশোধন ও ভোটার এলাকা স্থানান্তরসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও কাক্সিক্ষত সেবা না পাওয়া, কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা এবং দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, সময়মতো সেবা না পেয়ে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও ক্ষোভের চিত্র দেখা গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
সৌদি আরবপ্রবাসী ও উপজেলার কাপশতলা গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন দেশে এসে এনআইডি করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। নির্ধারিত দিনে ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য সকালে উপজেলা নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হন তিনি। কিন্তু উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নাজমুল হাসানের সঙ্গে দেখা করতেই বেলা ৩টা বেজে যায় বলে অভিযোগ করেন জসিম।
পরে নাগরিক সনদে ভুল থাকার কথা জানিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় জসিম অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার, ভুল তো আমি করিনি, করেছে অফিস। প্রবাসে চলে যাব, দয়া করে ছবিটা তুলতে দেন।’
তবে তাঁর অনুরোধে কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। হতাশা প্রকাশ করে জসিম প্রশ্ন তোলেন, আবেদন জমা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চোখে এই ভুল ধরা পড়েনি কেন?
প্রবাসে ফিরে যাওয়ার আগে এনআইডি-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পারার আশঙ্কায় তিনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে জানান।
ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী ওয়ালীদও। অটোরিকশা চালিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ চালানো এই শিক্ষার্থীর দাবি, নির্বাচন অফিসে কাজের গতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দালালচক্রের শরণাপন্ন হতে হয় তাঁকে। এ জন্য তাঁকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
তাঁর এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন অফিসে দালালদের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই চক্রের সঙ্গে অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন লায়লা আরজুমান বেগম নামের এক নারী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেছিলেন। এরপর বহুবার নির্বাচন অফিসে গেলেও তাঁর কাজ সম্পন্ন হয়নি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ অবধি বহুবার অফিসে গিয়েছি, কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই কাজ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বিচার কার কাছে দেব?’
দীর্ঘদিন ধরে সেবা না পাওয়ার এমন অভিযোগে নির্বাচন অফিসের সেবার মান ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার একজন কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নাজমুল হাসানের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কর্মকর্তা নিজেকে অনেক বড় অফিসার মনে করেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতেও আগে থেকে সময় নিতে হয়। কয়েকটি কথা জানতে চাইলে সংক্ষিপ্ত উত্তর পাওয়া যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে উপজেলা বিএনপির নেতা আক্তারুজ্জামান মজুমদার রকেট বলেন, প্রতিদিন বহু মানুষ এভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষকে যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি, অনিয়ম ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লালমাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নাজমুল হাসান।
তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র ঠিক থাকলে আমি কাউকে আটকাই না। অন্য অভিযোগগুলোও সত্য নয়।’
এ বিষয়ে লালমাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুব্রত বিশ্বাস দাস বলেন, ‘লালমাই উপজেলা নির্বাচন অফিস নিয়ে জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অবশ্যই কথা বলব। তাছাড়া, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুমিল্লা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, লালমাই উপজেলা নির্বাচন অফিসের ভোগান্তি নিয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি তাঁরা। তবে সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
