রোববার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩
দেশের অর্থনীতি: রাজস্ব খাতের সুরতহাল রিপোর্ট
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৯ এএম |

 দেশের অর্থনীতি: রাজস্ব খাতের সুরতহাল রিপোর্ট
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, তা থেকে বোঝা যায় রাজস্ব আয় অর্জনে এবং ব্যয় বর্জনে একটা পারস্পরিক পুশ ফ্যাক্টরের মধ্যে প্রবাহমান। রাজস্ব আহরণকে একটা কাক্সিক্ষত পরিমাণে উন্নীত করার যেমন জোর চেষ্টা চলছে তেমনি সুশাসন ও জবাবদিহির আকালে বাহুল্য ব্যয়ের বহর বেড়েই চলেছে।
বিপুল সংখ্যক করদাতা এখনো করজালের আওতায় আসতে পারেননি, আনা যায়নি। অন্যদিকে কর ও শুল্কায়নযোগ্য যে খাতগুলো বাদ পড়েছে বা বাইরে আছে সেগুলোকে শুল্ক ও করের আওতায় আনার চেষ্টাও চলছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই পরিশীলিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়ে একটা করদাতাবান্ধব ও উৎসাহ প্রণোদনামূলক পদ্ধতি গড়ে তোলা বা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। অর্থাৎ কর যারা দেয় না তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি কর প্রদানে যারা ফাঁকি দিচ্ছেন বা এড়িয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি কঠোর ও কঠিন মনোভাব পোষণ এবং সর্বোপরি কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতিকে জাতীয় দায়িত্ববোধের চেতনায় উত্তরণ ঘটানো। করদান ও আহরণের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা, জটিলতা ও স্পর্শকাতরতা রয়েছে তা দূর করে কার্যকর অবস্থায় নিয়ে আসতে সেই ’৯০-এর দশক থেকেই চেষ্টা চলছে।
’৯০ দশক পর্যন্ত আমদানি বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির সময়ে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা তেমন ছিল না বলে তখন আমদানি শুল্ক ব্যতিরেকে কর ও ভ্যাট রাজস্ব আহরণের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। ’৯০-এর দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ট্রেডিং-নির্ভরতা থেকে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে অগ্রসরসমান হয় তখন থেকেই শুল্কের চাইতে করের কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের হাত ধরে আমাদের রপ্তানি আয় ও উন্নয়ন বেড়ে গেলে এবং আমদানি ব্যয় হ্রাস পেতে থাকলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত বিষয়াদি নতুন করে জাতীয় ভাবভাবনার চৌহদ্দীতে চলে আসে।
রাজস্ব আহরণের প্রয়াস-প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেও কর জিডিপির রেশিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে এখনো অনেক পথ বাকি। বাংলাদেশের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বরাবরই নিম্ন পর্যায়ের আশপাশেই ঘুরছে, যদিও সব সময় কর রাজস্ব আহরণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিল বা আছে অনেক বেশি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হলেও তা পূরণে সফলতার গতি গজেন্দ্রগামী। এ ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত, অবকাঠামোগত এবং বিবিধ সব ধরনের ত্রুটি দূর করে উপযুক্ত করদাতাদের মধ্যে থেকে যত বেশি মানুষকে করের আওতায় আনা যায় সে চেষ্টাই যেন শুধু চলছে। পাশাপাশি যেসব নিত্যনতুন আর্থিক খাত তৈরি হচ্ছে সেগুলোকেও চটজলদি করের আওতায় আনার প্রয়াস চলছে। কিন্তু কর্মক্ষমতায় ও কর্মদক্ষতায় সে প্রয়াস কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনতে যথেষ্ট সময় নিচ্ছে।
প্রতি বছর যে অর্থবিধি জারি করা হয় সেখানে বিদ্যমান তিনটা রাজস্ব আহরণ আইনেরই সংশোধন ও সংযোজন পরিমার্জনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা জানি ইতোমধ্যে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের স্থলাভিষিক্ত একটা নতুন কর আইন তৈরি হয়েছে, এদিকে ১৯৬৯ সালের কাস্টমস আইনের সংস্কার ও আধুনিকীকরণের চেষ্টাও চলছে। পাশাপাশি ইনকাম ট্যাক্সের ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশটির নবায়ন ফাইনাল স্টেজে আছে। এসবের পাশাপাশি এবং এসব সত্ত্বেও ইদানীং দেখা যাচ্ছে অর্থবিধিতে বিস্তর রিভিশনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। বছর বছর ট্যাক্স রেট, কর রেয়াতের মাত্রা, অবকাশের হার ও ক্ষেত্রে নিত্য নতুন সংশোধন, সংস্কার প্রস্তাবনা প্রতি বছর যেন বেড়েই চলেছে।
প্রসঙ্গত, শুধু আয়করের ক্ষেত্রেই ৭৭টির মতো সংস্কার প্রস্তাব এসেছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অর্থবিধিতে। এ ক্ষেত্রে খেয়াল করতে হবে প্রতি বছরের অর্থবিলে যদি এক একটা আইনের ধারা-উপধারা অতি পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও সংশোধনের হিড়িক পড়ে তখন সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষে ওই সব পরিবর্তন ফলো করা কঠিন তো হয়ই, এসব প্রয়োগে জটিলতা আরও বাড়ে ছাড়া কমে না। ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় করদাতাদের। আইনের সংশোধন-সংক্রান্ত এসআরওর প্রয়োগ ন্যূনতম ৩ বছর বা তার বেশি হলে ওই এআরওর কার্যকারিতা অনুসরণ-অনুধাবন যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
এদিকে আয়কর পরিপত্র-১ জারিতে বিলম্ব করেও তাতে কিছু কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা নিরসনে ব্যাখ্যার অবকাশ থেকে যায়। এসবই সঠিক পরিমাণে ন্যায্য কর আদায়ের ক্ষেত্রে বিলম্ব সৃষ্টি বা অন্তরায় হিসেবে কাজ করতে পারে। পরিপত্রে স্পষ্টীকরণ করতে গিয়ে যে দীর্ঘসূত্রতা তা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব না হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিবেশগত নানা প্রভাব পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর আদায়ের জন্য অপারগ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
মানুষ আয় করে তার ওপর কর দেয়। এ ক্ষেত্রে তার আয়ের পথ ও পরিবেশ নিশ্চিত করা বা থাকাটা রাজস্ব আয় বৃদ্ধির করদানে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে সে সহজে কর দিতে পারবে। কিন্তু আয় করার পুরো বিষয় বুঝে ঝক্কিঝামেলা পোহাতে গেলে তারা নিরুৎসাহিত হবে। এ ক্ষেত্রে করমেলার মাধ্যমে সবাইকে বিষয়গুলো জানানো যায়। যেমন, যেসব করদাতা দূরে থাকেন তারা জানেন না কোথায় গিয়ে কীভাবে কর দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভোগান্তিরও শিকার হতে হয় তাদের। মেলা আয়োজনের ফলে করদাতা অফিসে যাওয়ার ঝক্কিঝামেলা এড়িয়ে অন দ্য স্পট সরাসরি সহজে কর দিতে পারবেন।
তিনটা খাত–শুল্ক, ভ্যাট এবং আয়কর থেকে রাজস্ব আহরিত হয়। এখানে সরাসরি রাজস্ব আহরণের পথ হচ্ছে আয়কর। আর ইনডাইরেক্ট হিসেবে রয়েছে ভ্যাট আর শুল্ক। কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডে রাজস্ব আহরণের দায়িত্বে আছেন বিসিএসের দুটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে বিসিএস (কর) ক্যাডার ডাইরেক্স ট্যাক্সের দায়িত্বে আর বিসিএস (কাস্টমস ও শুল্ক) ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স আহরণের দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বের অনেক দেশেই (যেমন ভারতেও) ডাইরেক্ট আর ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স আহরণের জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ বা দপ্তর রয়েছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় দুই স্বতন্ত্র ক্যাডার কর্মকর্তা দুই প্রকার রাজস্ব আহরণ করেন।
এ ক্ষেত্রে কর কিংবা ভ্যাট আরোপের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে তা সমন্বয়ের অভাবে। অসম আন্তসমন্বয়ের জটিলতা সৃষ্টির দ্যোতক হয়ে থাকে, এ ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। একসময় ইউটিআইন (ইউনিফাইড ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) প্রস্তাব করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ট্যাক্স, ভ্যাট, কাস্টম ডিউটি এগুলো আন্ডার ওয়ান কোড চলে এলে সুবিধা হতো যে দেখলেই বোঝা যেত কে কত ভ্যাট, ট্যাক্স প্রভৃতি দিচ্ছে, পাশাপাশি কার কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, তার কার্যক্রম কীভাবে চলছে সেটাও বোঝা সম্ভব হতো। কিন্তু সেই যৌথ ও সমন্বিত দেখভালের দর্শন বাস্তবায়নুগ পাওয়া যায়নি আন্তসমন্বয় সমস্যার কারণে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারযোগ্য বিষয় হলো নীতি প্রণয়নকারী ও বাস্তবায়নকারী, কার্যসম্পাদনকারী ও তার প্রতিকার প্রার্থনা শ্রবণকারী একই কর্তৃপক্ষ-কর্মকর্তা হওয়ায়। বাস্তবায়নকারী নীতি প্রণয়ন কিংবা নীতি প্রণয়নকারী বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকলে নীতিপ্রণয়ন ও বাস্তবায়ন উভয়ই সুবিবেচনা প্রাপ্ত হয় না। একইভাবে বাস্তবায়নকারীর দ্বারা সৃষ্ট অনিয়মের পরীক্ষা পর্যালোচনা বা আপিল শ্রবণের দায়িত্ব তার কাছে থাকলে সুবিচার নিশ্চিত হয় না।
এদিকে সবাইকে একই অর্থবছর জুলাই-জুন করে গেলে আরও কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক-বিমা ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠান সবার হিসাব দেখতে হয় নতুন করে। এ ক্ষেত্রে অনেক ভুলত্রুটি ধরা পড়ে। আবার গিয়ে সময়টা পড়ে সেই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে, ওদিকে পরের বর্ষার আগে আবার চলে বাজেট তৈরির কাজ। এ ক্ষেত্রে ভুল সংশোধনের পাশাপাশি কারও কারও দেড় বছরের হিসাব নতুন করে দেখতে হয়। ফলে নানা দিক থেকে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এসময়। কিছু কিছু কোম্পানি দেড় বছরের মাথায় এসে হিসাব মেলাতে বাধ্য হচ্ছে। এসব কারণে একটা বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায় জুন-জুলাই যাই হোক অন্তত বাংলাদেশের জন্য অর্থবছর হিসেবে এপ্রিল-মার্চ কিংবা জানুয়ারি-ডিসেম্বর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২