
বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ দুটি সংস্থা তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষ আরও চাপে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা বেশি নাজুক হতে পারে।
আগামী কয়েক বছরেও এ দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এমন মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিল। এটি বর্তমান অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়। ভবিষ্যৎ অর্থনীতিও খুব একটা ভালো থাকবে, তেমনটাও আশা করা যাচ্ছে না। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের টিকে থাকার জন্য এক ধরনের লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, গত চার বছরে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে আছে দেশের প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব লক্ষণীয়। তার ওপর দেশের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে আছে, বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান খুব একটা নেই বললেই চলে। শিল্পমালিকদের তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বড় ধরনের বেগ পেতে হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির এই নিম্নগামী অবস্থা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ করে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা যেখানে তাদের মন্দা কাটিয়ে ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাকফুটে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গত মাসে এডিবি বলেছে, এবার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এই দুই সংস্থাটির চেয়েও কম প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে। তারা বলেছে, মোট দেশজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এটি বিগত চার দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় শ্লথগতির ইঙ্গিত। তবে সরকার চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছে।
সরকারের দায়িত্ব এখন দুই দাতা সংস্থার পূর্বাভাসকে আমলে নিয়ে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এজন্য দরকার সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। আমরা লক্ষ্য করেছি, কার্যকর নীতি গ্রহণ খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। সরকারের আয় কম কিন্তু ব্যয় খুবই বেশি। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়ছে।
এরই মধ্যে সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়িয়েছে। বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কৃচ্ছ্রতা সাধন কেবল কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ছে না। এদিকটাও সরকারকে নজর দিতে হবে। এ অবস্থায় বর্তমান অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ কাজে লাগাতে হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির বাধা দূর করে সরকার সংকট উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
