ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টা আর উলুধ্বনিতে আজ মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ। দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। বেলগাছের নিচে শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান, পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ আর দেবীকে বরণের নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়বে ভক্তি ও উৎসবের আবহ।
আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠী। শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তিথিতে শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগ্রত করে মর্ত্যে পূজার জন্য আহ্বান জানানো হয়। আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে দেবীকে পূজামণ্ডপে আসার নিমন্ত্রণ জানানো এবং অধিবাসের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক পরিবেশ পবিত্র করার রীতি রয়েছে।
ষষ্ঠীপূজার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ বেলগাছের নিচে দেবীর বোধন। প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে, বেলগাছ ও বিল্বশাখাকে কেন্দ্র করে মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে এই আচার দেবীকে জাগ্রত করে পূজার সূচনার প্রতীক। সন্ধ্যায় পুরোহিতদের মন্ত্রধ্বনি, প্রদীপের আলো, ধূপের সুবাস আর শঙ্খধ্বনিতে সৃষ্টি হবে এক পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ।
মহাষষ্ঠীতে প্রতিটি মণ্ডপে ঢাকে পড়বে কাঠি, বাজবে ঢোল। সনাতনী ভক্তদের হৃদয়ে ধ্বনিত হবে মায়ের আগমনী বার্তা। ‘ঢাকের তালে, শঙ্খের বোলে—মা আসেন বাংলার কোলে’—এমন আবেগ ও আনন্দে দেবীকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত ভক্তরা।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এদিনের আচার-অনুষ্ঠান শেষে আগামী দিনের পূজাকে ঘিরে আরও বিস্তৃত হবে উৎসবের আয়োজন। মহাসপ্তমীর সকালে শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে নবপত্রিকা স্নান, প্রবেশ ও পূজার আয়োজন করা হবে। নবপত্রিকা হলো নয় ধরনের উদ্ভিদ বা পত্রগুচ্ছের সমন্বয়ে দেবীশক্তির আরাধনার একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি। এর মধ্যে কলাগাছকে শাড়ি পরিয়ে বধূরূপে সাজানো হয়, যা লোকপ্রচলিতভাবে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাবউকে ঘিরে নানা লোকাচার থাকলেও শাস্ত্রীয় পূজায় নবপত্রিকা দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়।
পঞ্জিকা অনুসারে, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন হবে নৌকায়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোটকে আগমন অস্থিরতা ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমন শস্যবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির বার্তা বহন করে বলে বিশ্বাস করেন ভক্তরা।
এদিকে, প্রতিমার সাজসজ্জা, মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন, আলোকসজ্জা ও পূজার আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে পূজার আয়োজক, পুরোহিত ও ভক্তদের মধ্যে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ঢাকিদের বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত, মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। পূজার দিনগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ—এমন প্রত্যাশা আয়োজকদের।
পঞ্জিকা অনুসারে, এবারের দুর্গোৎসবে তিথির বিশেষ বিন্যাসের কারণে মহাসপ্তমীর পূজার সময়সূচিতে বিশেষত্ব রয়েছে। মহাষষ্ঠীর পর ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা।
দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিরও এক অনন্য প্রকাশ। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর ফিরে আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবীর আরাধনা, ভক্তি ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা কামনা করবেন পরিবার, সমাজ ও বিশ্বমানবতার শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ। ঢাকের ছন্দ, শঙ্খের ধ্বনি আর ভক্তির অর্ঘ্যে আজ থেকে মুখর হয়ে উঠবে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিটি পূজামণ্ডপ।
