কুমিল্লার লালমাইয়ে ‘ধর্ষণের পর’ হত্যার শিকার স্কুলছাত্রীকে প্রতারণার মাধ্যমে এক তরুণ কক্সবাজারে নিয়ে এসেছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরী নামের ওই তরুণকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান।
বৃহস্পতিবার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে ১৫ বছরের কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত ছাত্রী ছিল। তার বাড়ি যশোরে। পরিবারের সঙ্গে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় থাকত সে।
বুধবার রাতে ওই কিশোরী কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরেছিলেন বলে আগেই জানিয়েছিল পুলিশ।
রোববার রাত ১০টার দিকে কলাতলী সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার পাশে হোটেল লুলুয়া বে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সেখানেই কাজ করতেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, “রাজু নিজেকে হোটেল মালিকের ছেলে এবং স্নাতক পাস পরিচয় দিয়ে কিশোরীকে প্রতারণার মাধ্যমে কক্সবাজারে এনেছিলেন। অথচ রাজু সেখানে কাজ করতেন এবং এসএসসি পাসও না।”
কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় কুমিল্লার তদন্ত কর্মকর্তারা রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।
পুলিশ কর্মকর্তা অহিদুর রহমান বলেন, “হয়তো রাজু খুন করেনি; কিন্তু খুনের আগে তিনি তো অন্যায় করেছেন।”
রাজুর দেওয়া তথ্যের বরাতে পুলিশ জানায়, ওই কিশোরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কক্সবাজার এসেছিলেন।
সোমবার দুপুরে রাজুকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী।
বাস সুপারভাইজারের বক্তব্য:
ওই কিশোরী কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাসে করে কুমিল্লায় ফিরেছিলেন। বাসটির সুপারভাইজার মো. রাসেল বলছিলেন, বাসটি কক্সবাজার থেকে ছাড়ার নির্ধারিত সময় দুপুর সাড়ে ১২টার হলেও বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রা শুরু করে দুপুর ১টার দিকে।
রাসেল বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সংস্কার কাজ ও যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় লাগে। রাত পৌনে ১১টার দিকে কুমিল্লার সোয়াগাজিতে কানন রেস্তোরাঁয় যাত্রাবিরতি করে বাসটি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাসের ডি-১ আসনের যাত্রী ওই কিশোরী কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে নেমে যান।
ডিএনএ পরীক্ষায় যাচ্ছে সোয়াবপোশাক, প্রেমিক রাজু কারাগারে:
এদিকে , কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি-না, তা জানতে ময়নাতদন্তের সময় সোয়াবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই নমুনা ও তার পরিধেয় পোশাক ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে যাচ্ছে।
তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনেরও ফরেনসিক নমুনা পরীক্ষা করা হবে। এসব আলামত ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর অনুমতি চেয়ে কুমিল্লার আদালতে আবেদন করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালমাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল ফারুক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্কুলছাত্রী হত্যার মামলায় গ্রেফতার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া শনিবার (১০ অক্টোবর) আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মেয়েটিকে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যার দায় স্বীকার করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘তদন্তে কোনো বিষয় বাদ যাবে না। শনিবার আসামিকে আদালতে হাজির করাসহ বেশ কিছু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন ভুক্তভোগীর সোয়াব, ফোন, পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত সিআইডির ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ওই কিশোরীর কক্সবাজারে যাওয়া এবং সেখানে আবাসিক হোটেলে এক তরুণের সঙ্গে অবস্থানের বিষয় শনাক্ত করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কক্সবাজারের হোটেলে কিশোরীটিকে ডেকে নেওয়া তরুণকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
পুলিশ জানায়, বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ফিরে কুমিল্লা নগরের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নামে ওই কিশোরী। পরে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাকে নগরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমিতে নিয়ে যান অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
পরে কিশোরীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে অন্য একটি অটোরিকশায় পালিয়ে যান সুমন। বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগৎপুর এলাকার একটি কৃষিজমি থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেফতার করে কুমিল্লায় নিয়ে আসে পুলিশ।
এদিকে ওই কিশোরীকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়া রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলি এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
রাজু বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বড়ঘোনা এলাকার মনির আহমেদের ছেলে। তিনি কক্সবাজার শহরের কলাতলি এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে বয় হিসেবে চাকরি করেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, কুমিল্লা পুলিশের অনুরোধে রাজুকে আটক করা হয়। পরে সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে রাজুকে হস্তান্তর করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পুনরায় রাজুকে থানায় এনে হস্তান্তর করে চলে যায় কুমিল্লা পুলিশ। সন্ধ্যায় ৫৪ ধারায় কক্সবাজার পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স ভাড়া বাসা থেকে বের হয় ওই কিশোরী। পরে ৭ অক্টোবর দিনগত রাত ১২টা ১৯ মিনিটের সময় তাকে সবশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা গেছে। ওইদিন রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে তার লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলে একটি বার্তা দেয়। তখন বাবা ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পাননি।
পরদিন সকালে অজ্ঞাত হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে ওই দিন লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে কিশোরীল (১৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
