
চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন বুলেট বৈরাগী। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ২৫ এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ। মরদেহে আঘাতের একাধিক চিহ্ন ছিল। ঘটনার রাতে কুমিল্লায় বাস থেকে জাগুরতলী এলাকায় নামেন বুলেট। এই সময়ে ওত পেতে থাকা অবস্থায় ভুক্তভোগীকে টার্গেট করা হয়। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে তাকে মারধর ও ছিনতাইয়ের পর চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সে সময় র্যাব জানায়, এই খুনের সঙ্গে জড়িত পাঁচ সদস্যের একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। সিএনজিতে যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে তারা বুলেটের জীবন কেড়ে নেয়।
এর ৬ মাসপর গত ৮ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নেমে সিএনজি অটোরিকশাযোগে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের নিজ বাসায় ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের স্বীকার হন সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজনিম। এই ঘটনাতেও, জড়িত সিএনজি অটো রিক্সা চালক। ওই রাতে কুমিল্লা শহরের দিকে শর্টকাটে আসার কথা বলে তাজনিনকে নিয়ে নানান জায়গায় ঘুরে অবশেষে লালমাই এলাকার জগতপুরে ধানক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে তাকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত সিএনজি চালক সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ এবং তার জবানবন্দীতে উঠে এসেছে এই রোমহর্ষক বর্ণনাও।
তদন্তে উঠে এসেছে দু'টি ঘটনাতেই সরাসরি জড়িত সিএনজি অটোরিকশা চালক।
লালমাই থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, তাজনিম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে যে সিএনজি চালক সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে - সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশায় থাকতো। সিএনজিটিতে যদি নাম্বার প্লেট না থাকতো তাহলে আরো বেশি দুঃসাধ্য হত তাকে বের করা। তারপরেও আমাদেরকে বেগ পেতে হয়েছে।
ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। এই মহাসড়কেরই গুরুত্বপূর্ণ ১০০ কিলোমিটারের বেশি অংশ কুমিল্লা জেলায় পড়েছে। যে কারণে এই জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে যাত্রী ওঠানামা কেন্দ্র। মহাসড়ক ধরে রাতবিরেতে হাজার হাজার যাত্রী যাতায়াত করে বিভিন্ন এলাকায়। বেশিরভাগ যাত্রীর বাস থেকে নেমে একমাত্র উপায় সিএনজি অটোরিকশা ধরে যেতে হয় পরবর্তী গন্তব্যে। কিন্তু রাতের এই অটোরিকশা যখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয় তখন ক্ষোভ ও বিষ্ময় প্রকাশ করেন এই সিএনজি চালিত অটো রিক্সার চালকরাই।
সিএনজি অটোরিকশাচালকরা নিজেরাই বলছে, মহাসড়ক ও সংযোগ সড়কে রাত-বিরেতে যেসব সিএনজি অটো রিক্সা চলে এর ৭০ ভাগেরই কোন কাগজপত্র বা লাইসেন্স নেই। এইসব সিএনজির চালক কিংবা মালিক কারা- এর কোন ডাটাবেজ নেই কারো কাছে। এসব সিএনজি অটো রিক্সা দিয়ে যদি দিনে রাতে কোন অপরাধ সংঘটিতও হয় সেটি তদন্ত দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বাস্তবতায় দেখা গেছে এইসব অটো রিকশায় করে ছিনতাই এর উদ্দেশ্যে উৎপাতে থাকে একশ্রেণীর অপরাধী। যারা ছিনতাই শেষে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনাও ঘটাতে পিছপা হয় না। সিএনজি অটো রিকশাতে করে যাত্রীদের সে শয়তানের নিশ্বাস দিয়ে প্রতারণা করার একদল অপরাধ হয়েও সক্রিয় এই অংশটিতে। প্রতিনিয়ত মাদক নিয়ে পুলিশ, আরএসবি, বিজিবির হাতে ধরা পড়ছে এসব সিএনজি অটোরিকশা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় বাইপাস হয়েছে কুমিল্লা নোয়াখালী মহাসড়ক ও কুমিল্লা শহরের সংযোগ সড়ক। এছাড়াও পদুয়ার বাজার থেকে ময়নামতি সেনানিবাস পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি স্পটে রাতের বেলায় যাত্রী ওঠানামা হয়। পদুয়ার বাজার, কোটবাড়ি বিশ্বরোড, জাগুরঝুলি, আলেখারচর, ময়নামতি সেনানিবাস এই এলাকাগুলোতে যাত্রী পরিবহনে রাতের বেলা অপেক্ষা করে অন্তত দুইশত সিএনজি অটোরিকশা। রাতের বেলা গণপরিবহন সংকট থাকে বিধায় এসব অটোরিকশা চড়ে বাধ্য হয়ে শহরে বা বাড়ি ফিরতে হয় যাত্রীদের। এসব সিএনজির বেশিরভাগেরই লাইসেন্স নেই অথবা চালকের পরিচয় নেই। অনেক সিএনজি অটো রিক্সার চালকরা আবার পাশে অন্য উপজেলা কিংবা অন্য জেলা থেকে। চালকরাই বলছে, 'বদলি ড্রাইভার' নামে অস্থায়ী চালকদের হাতে থাকে এসব পরিবহন। সেগুলোকে ব্যবহার করে হয় নানান অপরাধ।
পদুয়ার বাজার হোটেল নূর জাহানের সামনে কথা হয় স্থানীয় সিএনজি চালক আবদুর রহিমের সাথে। তিনি বলেন, 'আমি ৩০ বছর সিএনজি চালাই। দিনে যারা চালায় তাদের সবাই সবাইরে মোটামুটি চিনি। কাওর নিজের সিএনজি, কেউ ভাড়ায় চালায়। আর কাগজ না থাকলে কে ড্রাইভার, কে ঠ্যাকবাজ কেমনে চিনমু?
সিএনজি চালক হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা শুনি -খুন বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব সিএনজি ড্রাইভাররা করে। এখন একজন দুই জনের জন্য সবাইর দোষ হয়। আমরাও চাই লাইসেন্স হউক। ড্রাইভার পরিচয় দিয়ে চলুক।
পদুয়ার বাজারেই কথা হয় কুমিল্লা শহরের ব্যবসায়ি শরিফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, আমরা রাত বিরাতে ঢাকা- চিটাং থেকে আসা যাওয়া করি। বেশির ভাগ সময় রাতেই। আগে ফিরতে ভয় লাগতো না। এখন পরিচিত সিএনজি শহর থেকে আনিয়ে বাসায় ফিরি। অপরিচিত সিএনজিতে উঠিই না।
কুমিল্লার হাইওয়ে পুলিশের থানার এক সাবেক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অপরাধ প্রবণ এলাকা পদুয়ার বাজার। ওখানেই ওৎ পেতে থাকে ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টি সদস্যরা। সেখান থেকে সিএনজি কিংবা ছোট ছোট যানবাহন ব্যবহার করে এসব ছিনতাই এর ঘটনা ঘটায় তারা। তবে এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় - বরং এই অপরাধের সাথে জড়িত থাকে বেশ কয়েকটি চক্র। তারা হয়তো এই জেলার না কিন্তু অন্য জায়গা থেকে এসে এসব ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। যানবাহন রেজিস্টার্ড না থাকলে কিংবা ঠিকমতো চেকপোষ্ট না হলে তাদেরকে ধরা সম্ভব না।
কুমিল্লা বিআরটিএ- অফিস থেকে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলায় রেজিস্টার্ড সিএনজি অটো রিক্সার সংখ্যা ২২ হাজার ২৪৭ টি। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, এই জেলায় সিএনজি অটো রিক্সার সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার হতে পারে। তবে সিএনজি অটোরিক্সার কতজনের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিংবা এসব রেজিস্টার্ড অটোরিক্সা কোন সংগঠনের নিবন্ধিত কিনা সেই বিষয়ে কোন তথ্য দিতে পারেনি কর্মকর্তারা।
বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মোঃ ফারুক আলম জানান, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি অটোরিক্সা সিএনজির মালিকদেরকে নির্দেশনা দেয়া হবে নিয়োগবিধি বা প্রক্রিয়া থাকবে। এর বাইরে যে সিএনজি অটো রিক্সায় সেটির জন্য মালিকও জেলে যেতে পারে।
চট্টগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী আবু মুসা জানান, 'রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সিএনজি অটোরিকশা কিংবা লাইসেন্স ছাড়া চালকের দ্বারা কোন অপরাধ সংগঠিত হলে - বি আর টি এ কিংবা হাইওয়ে পুলিশ কেউ দায় এড়াতে পারবেন না। মহাসড়কে জননিরাপত্তা দিতে প্রশাসন সব সময় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিতে হবে। কিন্তু ধর্ষণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ হয়ে গেলে তারপর সিএনজি অটোরিকশা কিংবা চালক খুঁজে কি লাভ হবে?'
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কীর্তিমান চাকমা বলেন, 'আমার যে জনবল আছে, যানবাহন- তা দিয়ে পর্যাপ্ত চেকপোস্ট কিংবা টহল চালনা খুবই কষ্টকর। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আসলেও কুমিল্লা -নোয়াখালী কিংবা কুমিল্লা -চাঁদপুর মহাসড়ক সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি। আমরা চেষ্টা করি।'
তিনি আরো বলেন, সিএনজি অটো রিক্সা গুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা বিআরটিএর কাজ। তারা চাইলে অভিযান পরিচালনাও করতে পারে। আমরা সহযোগিতা করব। রেজিস্ট্রেশন কিংবা লাইসেন্স না থাকলে কাউকে ডিটেক্ট করা খুবই কষ্টসাধ্য। সে ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের সাথে সমন্বয় করা যেতে পারে।
সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাজনিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটো রিক্সার চালকদের অপরাধ প্রবণতা বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, এটি মহাসড়ক পুলিশের বিষয়, এ নিয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে জেলা পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে।
পর তোর বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর তাজনিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারো কুমিল্লা জেলার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সাধারণ মানুষ। রোববার কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির কার্যপত্র বিবরণী থেকে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় মোট ১৬ টি খুনের ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে।
মহাসড়কের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী বলেন, আমরা দ্রুত চেষ্টা করব সিএনজি অটো রিক্সা ও চালকদেরকে ডাটাবেজের আওতায় আনতে। প্রত্যেকটি সিএনজিতে মালিক ও চালকের তথ্যসম্বলিত কার্ড রাখতে হবে। এসব উদ্যোগ ও পরামর্শের কথা সভা থেকে নিয়েছি।
