মৃত্যুর আগে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলো পনেরো বছরের জান্নাতুল তাজমিন। সিএনজির অটোরিকশার চালক যখন তাকে শর্টকার্টের কথা বলে ভুলপথে লালমাইয়ের জগতপুরে নিয়ে যায়, সেখানে বাঁচার জন্য তাজমিন ধস্তাধস্তি ও চিৎকার শুরু করলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন ঘাতক সুমন। এতে তাজমিন অচেতন হয়ে পড়লে ধানক্ষেতে কাঁদাপানিতে ফেলে অচেতন অবস্থায় তাকে ধর্ষণ করা হয়। এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ^াসরোধে হত্যা নিশ্চিত করেন সুমন মিয়া। পরে তার মরদেহ ধানক্ষেতের কাদাপানিতে ফেলে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় সুমন মিয়া। পরে শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে বর্ণনা তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) পংকজ বড়ুয়া।
নিহত জান্নাতুল তাজমনি (১৫) কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাড়ি যশোর জেলা সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে। এ ঘটনায় লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা করেন তার বাবা মো. আবদুল আলীম।
লোমহষর্ক বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ জানায়, মৃত্যুর আগে তাজমিন তার বাবার কাছে একটি ক্ষুদে ম্যাসেজ পাঠায়, ম্যাসেজে লোকেশন দিয়ে লেখেছিলেন, ‘বাবা তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও’ বেশি রাত হওয়ায় তার বাবা ঘুমিয়ে পড়ায় ওই ম্যাসেজ সিন করতে পারেনি। সকালে ভোরে যখন ম্যাসেজ দেখেছেন ওই লোকেশন অনুযায়ী গিয়ে তার বাবা তাজমিনের মরদেহ দেখতে পায়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ আরও জানায়, গত ৪ অক্টোবর বান্দবির বাসায় যাওয়ার কথা বলে তাজমিন ঘর থেকে বের হয়। সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক রাত থেকে পরদিন কুমিল্লায় এসে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যায়। সেখান থেকে ৭ অক্টোবর বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে এসে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে নামেন জান্নাতুল তাজমিন। এরপর মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য কয়েকটি দোকান ঘুরাঘুরি করেন। এর এক পর্যায়ে তাজমিন ৩০০ টাকায় রেসকোর্সের নিজ বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজি ভাড়া নেন। কিছুদূর যাওয়ার পর চালক সুমন মিয়াকে ১০০ টাকা দিয়ে পাউরুটি ও কলা কিনতে বলেন তিনি। পাউরুটি ও কলা কেনার পর সুমন মিয়া শর্টকাট রাস্তা দিয়ে রেইসকোর্স নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নুরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুর সড়ক হয়ে বিজরা বাজারের দিকে নিয়ে যায়। পরে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর উত্তরপাড়ার অন্ধকার ও নির্জন একটি রাস্তার পাশে সিএনজি থামান চালক সুমন মিয়া। নির্জন স্থানে সিএনজি থামানোয় ভয় পেয়ে তাজমিন চালকের কাছে জায়গাটি কোথায় জানতে চায়। সুমন মিয়া জানান, এটি রেইসকোর্স নয় বলে জানালে এরপর জান্নাত বুঝতে পেরে সিএনজি থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় চালক সুমন মিয়া তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাজমিন রাস্তার দুই পাশে কয়েকটি ধানক্ষেতে ছুটাছুটি করেও বাঁচতে পারেনি। এক পর্যায়ে জান্নাতুল চিৎকার করলে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরেন সুমন। এরপর অচেতন হয়ে পড়লে তাকে কাঁদাপানিতে ফেলে ধর্ষণ করে এরপর শ^াসরোধে হত্যা নিশ্চিত করে মরদেহ ধানক্ষেতে ফেলে রাখে। ঘটনা পর সুমন পালিয়ে যাওয়ার তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে রাস্তার পাশে সিএনজি ফেলে কাচিকাটা মসজিদের পুকুরে এসে গোসল করেন। পরবর্তীতে বাখরাবাদ এলাকায় একটি পুকুর পাড়ের জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে ভোড়ে চট্টগ্রামে চলে যায় সুমন। সুমনকে আটকরে পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকায় একটি পুকুর পাড় থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করেন।
এদিকে, আদালতে জান্নাতকে হত্যাকাণ্ডের জড়িত থাকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে সুমন মিয়া। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে কুমিল্লা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ৬ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তিনি। পরে তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের একটি নির্জন রাস্তার পাশে ধানক্ষেত থেকে স্কুলছাত্রী জান্নাত তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় সিএনজি চালক সুমন মিয়াকে শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে আটক করে কুমিল্লায় নিয়ে আসেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
