কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বসতবাড়ির সামনে উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে মাচা তৈরি করে হাজারী জাতের উচ্চফলনশীল লাউ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কৃষক চাচা-ভাতিজা কবির হোসেন ও ফারুক মিয়া। কম খরচে ভালো ফলন ও লাভ হওয়ায় তাদের দেখে আশপাশের কৃষকরাও লাউ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের কালিকাপুর দক্ষিণপাড়া ও পাশের গ্রাম জঙ্গলবাড়ি পূর্বপাড়ায় তিন খণ্ডে প্রায় এক একর জমিতে চাচা-ভাতিজাসহ কয়েকজন কৃষক এবার হাজারী জাতের লাউ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ফারুক মিয়া ২০ শতক এবং কবির হোসেন, দুলাল মিয়া ও সাইফুল ইসলাম মিলে প্রায় ৬০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষক ফারুক মিয়ার বাড়ির পূর্ব পাশে সবজি বাগানে মাচা তৈরি করে লাউয়ের গাছ তুলে দেওয়া হয়েছে মাচায় । মাচা থেকে সারি সারি ঝুলছে অসংখ্য লম্বা সবুজ লাউ। পুরো বাগানজুড়ে দেখা মিলছে কচি ও পরিপক্ব লাউয়ের।
কৃষক ফারুক মিয়া এবিষয়ে জানান, ২০ শতক জমিতে লাউ চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮-৯ হাজার টাকা। প্রথম দিনেই প্রায় ১০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে আকারভেদে প্রতিটি লাউ ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আরও ১২-১৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রির আশা করছেন তিনি। গাছ ভালো থাকলে পরবর্তীতেও লাউ এবং আগা-ডগা বিক্রি করে আয় করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে কৃষক কবির হোসেন জানান, লাউ চাষে মোট খরচ হয়েছে সবার প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা। প্রথম দফায় প্রায় ৬৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন সবাই। প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে লাউ বাজারজাত শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন শুধু চাচা ভাতিজাই । স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব লাউ কুমিল্লা শহরেও যাচ্ছে।
কবির হোসেন আরও জানান, গত শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে হাজারী লাউয়ের বীজ রোপণ করেন। প্রায় দুই মাস পরিচর্যার পর গাছে ব্যাপক ফলন আসে। লাউয়ের পাশাপাশি তিনি বেগুন, করলা, টমেটো ও ধান চাষেও সফলতা পেয়েছেন।
কৃষক ফারুক মিয়া এ বছর লাউয়ের পাশাপাশি লম্বা বেগুন, শসা, চালকুমড়া ও ঝিঙে চাষ করেছেন। ধান ও ঢেঁড়স চাষেও এলাকায় তার সুনাম রয়েছে।
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক শরিফুর রহমান বলেন, বাড়ির সামনে প্রায় ২০ শতক জমি বছরের বেশিরভাগ সময় পরিত্যক্ত থাকত। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে ফারুক মিয়া ও তার চাচা কবির হোসেন বিভিন্ন সময়ে সেখানে চাষাবাদ করেছেন। এবার নিজ উদ্যোগে হাজারী লাউ চাষ করে তারা ভালো ফলন পেয়েছেন। একই পদ্ধতিতে পাশের গ্রামের সাইফুল ও দুলাল মিয়াও লাউ চাষ করে সফল হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা আফরিন আক্তার বলেন, বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কৃষকদের উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানজিনা আক্তার জানান, হাজারী লাউ একটি উচ্চফলনশীল জাত। রোপণের পর ৫-৭ দিনের মধ্যে চারা হয় এবং ৪২-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ও ফল আসে। প্রায় ৬০-৭০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা যায়। দেখতে আকর্ষণীয়, সুস্বাদু এবং বাজারে চাহিদা ও ফলন বেশি হওয়ায় এ জাতের লাউ চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
কৃষক ফারুক মিয়া জানান, বাগানে জৈব সারের পাশাপাশি সামান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করেছেন। কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। ফলে উৎপাদিত লাউ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে।
মাত্র দুই মাসের মধ্যে কম খরচে ভালো ফলন ও আয় পাওয়ায় খুশি কৃষক চাচা-ভাতিজা কবির হোসেন ও ফারুক মিয়া। তাদের এ সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
