আবির হোসেন, মোঃ জাহিদ ও মিজানুর রহমান। তারা স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। এক বছর আগেও বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়িতে পৌঁছে তিনজনই মোবাইল ফোন দেখা ও অনলাইন গেমস্ েব্যস্ত থাকতো। একে অপরের সাথে পড়ালেখা বা সুখ-দুঃখের কোন কিছুই শেয়ার করতো না। সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন কাশিনগর এলাকা পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে তাদের সাথে দেখা হয়। ওই সময় তিনি গাড়ি থামিয়ে তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং একটি ফুটবল উপহার দিয়ে প্রতিদিন বিকেলে মাঠে খেলতে বলেন। হঠাৎ করে একজন সরকারি কর্মকর্তার সাথে দেখা ও ফুটবল পেয়ে তারা খুশিতে আত্মহারা। এখন প্রতিদিনই স্থানীয় মাঠে ফুটবল খেলছে তারা।
এই তিনজনের মতো উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের তরুণদের খেলার সামগ্রী দিচ্ছেন ইউএনও শাহাদাত হোসেন। এছাড়া উপজেলা সদরের চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে খেলাধুলা সঠিকভাবে করতে মাঠে বালু ভরাট ও পাশে দর্শকদের জন্য ‘বিশেষ মাচা’ বসিয়েছে পৌর প্রশাসন। গত তিন মাসে বিকেল বেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাঠগুলোতে চলছে তরুণদের ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা। বড় বড় মাঠগুলোতে স্থানীয় স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোগে চলছে ফুটবল প্রতিযোগিতা। চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে শুরু হয়েছে ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল’ টুর্ণামেন্ট। খেলা দেখতে উৎসুক শত শত কিশোর-তরুণ মাঠে ভীড় করছে। অধিকাংশ তরুণ মোবাইল ফোন ও মাদকের আসক্তি থেকে দূরে সরছে।
সরেজমিন পরিদর্শন করে জানা গেছে, খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা বা বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি একটি সুস্থ, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর উপায়। নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়। অপরদিকে বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেমস্ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলে ব্যস্ত থাকার ফলে তারা মাঠের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকান্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মোবাইল ও মাদক আসক্তি কমাতে খেলাধুলাকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখে ইউএনও শাহাদাত হোসেনের পরামর্শে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোগে নিয়মিত ফুটবলসহ অন্যান্য খেলাধুলার প্রতিযোগিতা চলছে।
বিশিষ্ট ক্রিড়া ব্যক্তিত্ব মানবিক চিকিৎসক ডা. মঞ্জুর আহমেদ সাকি বলেন, ‘নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করলে শিশু-কিশোরদের শারীরিক বিকাশ ভালো হয়, কর্মক্ষমতা বাড়ে এবং অলসতা কমে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়। খেলাধুলা মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মাঠের সবুজে ফিরিয়ে আনার জন্য খেলাধুলা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় খেলাধুলার জন্য নির্ধারণ করা হলে মোবাইল ও অনলাইন গেমসে অতিরিক্ত সময় কাটানোর প্রবণতা কমানো সম্ভব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া সংগঠন ও সমাজকে এ ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনে মানবাধিকার, বর্ণবাদ ও সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, পরিচ্ছন্ন ক্রীড়া পরিবেশ তৈরি এবং সকল শ্রেনী পেশার মানুষের ক্রীড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সহিংসতার পরিবর্তে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতেও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, গুণবতীসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রান আফটার ফজর নামেও একটি কর্মসূচি চলছে। এতে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনা শেষে দৌঁড় প্রতিযোগিতার কারণে শারিরীক বিকাশ, কর্মক্ষমতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। তাই সুস্থ দেহ এবং সমাজ গঠনে ক্রিড়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই’।
ক্রীড়া সংগঠক ও কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মানুষ সুস্থ ধারার বিনোদন চায়। আমরা যেভাবে প্রযুক্তির ডিভাইসের মধ্যে হাবুডুবু খাই, সেটা সার্বিকভাবে ক্ষতিকর। বর্তমানে এক শ্রেণীর মানুষ খেলাধুলা করতে চায়, আরেক শ্রেণীর মানুষ দেখতে চায়। মানুষ নিজেকে সংশোধন করতে শিখেছে। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে বিভিন্ন এলাকায় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ফুটবল খেলা প্রতিযোগিতা চলছে। বর্তমানে শহরে এলিট শ্রেণীর অভিভাবকরাও সন্তানদের খেলাধুলা করার জন্য বিভিন্ন মাঠে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ভালো থাকলে খেলাধুলা আরও সম্প্রসারণ হবে। বর্তমান সরকার হাইস্কুল পর্যায়ে ‘নতুন কুড়ি’ এবং কলেজ পর্যায়ে ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ড ম্যাডেল’ দুইটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। ফলে সারাদেশেই খেলার প্রতি কিশোর ও যুবকদের আগ্রহ বাড়ছে’।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাদক, কিশোর গ্যাংসহ নানা অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তাদের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। খেলাধুলা এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যেই চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন খেলার মাঠ সংস্কার ও ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু মাঠ সংস্কার নয়; বরং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করে তাদের একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া’।
