প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৭ এএম আপডেট: ২৮.০৯.২০২৬ ১:৩৩ এএম |

কুমিল্লা- বাগড়া সড়কটি যেন মৃত্যুফাদ৷ প্রতিদিন কুমিল্লা টু বাগড়া সড়কটি দিয়ে চার উপজেলার হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে৷ কোথাও পিচ উঠে বেরিয়ে এসেছে ইট-সুরকি, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। সেই গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে হঠাৎ কাত হয়ে যাচ্ছে সিএনজি চালিত অটোরিকশাসহ ব্যাটারী চালিত ইজিবাইক উল্টে পরে যাত্রীদের কেউ আহত হচ্ছেন, কেউ আবার আতঙ্কে আঁকড়ে ধরছেন গাড়ির আসন। ফলে প্রতিদিনই অসংখ্য যাত্রী গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন। প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে এ সড়কে চলাচলকারী ছোট বড় যানবাহনগুলো। প্রতিদিন এমন দৃশ্যই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে কুমিল্লা-শশীদল-বাগড়া সড়কে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার উত্তরাঞ্চল, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটিতে। বন্যার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সড়কটির বড় একটি অংশ এখনো সংস্কার না হওয়ায় এটি পরিণত হয়েছে মানুষের দুর্ভোগ ও ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে। বিশেষ করে কুমিল্লা সদর উপজেলার চাঁনপুর ব্রিজ থেকে মাঝিগাছা, আমড়াতলী ইউনিয়নের তৈলকুপি বাজার হয়ে বুড়িচং উপজেলার ফকিরবাজার, কালিকাপুর, ছয়গ্রাম ও শংকুচাইল বাজার পর্যন্ত অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। কুমিল্লা সদর থেকে ব্রাহ্মণপাড়ার বাগড়া পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার মানুষের পাশাপাশি ব্রাহ্মবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া এলাকার মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। অথচ সড়কের বেহাল দশার কারণে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি এখন আর স্বাভাবিক চলাচলের উপযোগী নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, তৈলকুপি বাজার থেকে বুড়িচং উপজেলার কালিকাপুর বাজার এলাকার বিভিন্ন অংশে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ইট-সুরকি। কোথাও ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। আবার কোথাও গর্ত এতটাই গভীর যে গাড়ি চালাতে গিয়ে চালকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

খানাখন্দে ভরা সড়কটিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ছোট ট্রাক চলাচলের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এতে পথচারী ও যাত্রীদেরও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা। সড়কের এই দুরবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, নারী ও বয়স্করা। অসুস্থ রোগী নিয়ে কুমিল্লা শহরের দিকে যাত্রা করাও অনেকের কাছে আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝাঁকুনিতে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ বিকল্প পথে অতিরিক্ত দূরত্ব পাড়ি দিয়ে শহরে যাচ্ছেন। বুড়িচং উপজেলার ছয়গ্রাম এলাকার বাসিন্দা গাজী মনির হোসেন বলেন, সদর উপজেলার মাঝিগাছা এলাকার নন্দীর বাজার থেকে বুড়িচংয়ের গাজীপুর বাজার পর্যন্ত সড়কটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে এটি এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। সড়কের প্রতিটি বড় গর্তই যেন মৃত্যুর ফাঁদ। দিনের পর দিন মানুষ কষ্ট করছে, কিন্তু আমাদের এই দুরবস্থা দেখার যেন কেউ নেই। পার্শ্ববর্তী দক্ষিণগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মেহেরাবুন্নেছা বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে ডাক্তার দেখাতে কুমিল্লা শহরে যেতে ভয় লাগে। এই সড়ক দিয়ে গেলে শরীরের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার বেশি ঘুরে অন্য সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি ভাড়াও বেশি লাগে। শুধু যাত্রী নয়, সড়কের বেহাল দশার কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন চালকরাও। সিএনজি অটোরিকশা চালকদের অভিযোগ, খানাখন্দে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। ফলে মেরামতের খরচ বাড়ছে, পাশাপাশি শারীরিকভাবেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। সড়কের বেহাল দশার প্রভাব পড়েছে যাত্রীভাড়াতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লা শহর থেকে গাজীপুর বাজার পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা হলেও সড়কের খারাপ অবস্থার অজুহাতে অনেক সময় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বাগড়া এলাকার সিএনজি চালক মো. সেলিম মিয়া বলেন, সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে একদিন বের হলে পরের দুই দিন শরীরের ব্যথার কারণে ঘরে থাকতে হয়। সড়কের এমন অবস্থায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত কষ্টকর। গাড়িরও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। এ কারণে বাধ্য হয়ে ভাড়া কিছুটা বেশি নিতে হয়। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করে এই দুর্ভোগ থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের বন্যার পর থেকেই সড়কটির বিভিন্ন অংশের ক্ষতি স্পষ্ট হলেও দীর্ঘ সময়েও স্থায়ী সংস্কার হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গর্ত ও ভাঙন আরও বেড়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানি জমে অনেক গর্ত চোখে দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছে, সড়কটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে। কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে বৃষ্টি ও বর্ষার মৌসুম চলায় সড়কের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বর্ষা শেষ হলেই কাজ শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে সড়কটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খুব শিগগিরই সংস্কারকাজ শুরু হবে। দুই বছর আগে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রন্ত সড়কটি এখন স্থানীয় মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের আশ্বাস আর সংস্কারের অপেক্ষায় দিন কাটছে কয়েক লাখ মানুষের। তাদের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুত প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হয়ে কুমিল্লা-বুড়িচং-বাগড়া সড়কটি আবারও নিরাপদ ও স্বাভাবিক যোগাযোগপথে ফিরে আসবে।