
একটা সময় ছিল, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়েছিল। আমদানি ব্যয় মেটানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল।
সেই সময় গত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত বছরের আগস্ট শেষে রিজার্ভ ছিল ২৯.৭৯ বিলিয়ন, আর চলতি বছরের আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৪০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এই হিসাবে গত এক বছরের ব্যবধানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ৭.৬১ বিলিয়ন ডলার। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক টানাপড়েন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও রিজার্ভ বৃদ্ধির ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও আশা-জাগানিয়া।
কালের কণ্ঠে গতকাল প্রকাশিত খবরে জানা যায়, রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স (প্রবাস আয়) ও রপ্তানি আয়। বৈধ পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ায় দেশে ডলারের জোগান বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বাজারকে বাজারভিত্তিক করার নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা এসেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে রিজার্ভ ছিল ৩৩.১৭ বিলিয়ন ডলার।
আবার ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৩০.৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। জুনে রিজার্ভ বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৭.৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। জুলাই শেষে কিছুটা কমে ৩৬.৪২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও আগস্টে আবার বেড়ে ৩৭.৪০ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। ধারণা করা হয়, এর ফলে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি করে প্রবাস আয় এসেছে। রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি রয়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে স্বস্তির ব্যাপার হলো, আমদানি ব্যয় পরিশোধে সক্ষমতা বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে—রিজার্ভে সক্ষমতার কারণে চড়া দামেও জ্বালানি কেনা যাচ্ছে। এ ছাড়া শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বিল পরিশোধে সরকার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রিজার্ভ বৃদ্ধির এই স্বস্তির আড়ালে অর্থনীতির জন্য কিছু অস্বস্তিও রয়েছে। কেননা দেশের অর্থনীতি বিনিয়োগ পরিবেশে এখনো স্থবিরতা বিরাজ করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আশাব্যঞ্জক নয়। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। এতে ডলারের চাহিদা কম থাকায় রিজার্ভেও চাপ কম পড়েছে। অর্থাৎ বাস্তবতা হলো, রিজার্ভ বাড়লেও অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। রিজার্ভ বৃদ্ধির এই বৈপরীত্যই এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দেড়-দুই বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। কারণ এই সময়ে রিজার্ভ ভালো ছিল। রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। আবার আমদানির চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ২০২৯ সাল নাগাদ প্রায় সাত বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে।’
আমরা মনে করি, রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক বটে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে রিজার্ভ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে; তবেই রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা অটুট থাকবে।