
বর্তমান সময়ের অত্যন্ত বিতর্কিত অথচ বিস্ফোরক এক ব্যক্তিত্ব চন্ডিল ভট্টাচার্য (চন্ডিল বাবু)। তিনি যখন তার স্বভাবসিদ্ধ কামানের গোলার মতো যুক্তিতে সমাজের তথ্যকষিত সভ্যতার মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে দেন, আমাদের শিক্ষিত ও তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজ তখন তা শুনে হাততালি দেয়। এই হাততালিটা আসলে এক ধরনের ‘ডিফেন্স মেকানিজম’। চন্ডিল বাবু তার বিভিন্ন ভাষ্য বা সাক্ষাৎকারে যখন আমাদের এই ‘হাফ-সিভিলাইজড’ বা ‘হাফ-এডুকেটেড’ সমাজের কাপড় খুলে দেন, তখন সেই নগ্নতা ঢাকতেই আমরা হাসির রোল তুলি। এই সমাজেই একদল মানুষ আছেন যাদের আমি বলি ‘ইন্টেলেকচুয়াল ডংকি’ (ওহঃবষষবপঃঁধষ উড়হশবু)। এই বুদ্ধিজীবী গাধারা সব বোঝেন, সব জানেন, কিন্তু সমতার ঘাস আর সুযোগ-সুবিধার গাজর সামনে ঝোলানো থাকে বলে তারা চোখ-কান বন্ধ করে ব্যবস্থার বোঝা বয়ে বেড়ান। তাদের মগজ আছে, কিন্তু মেরুদণ্ডটি বহুকাল আগেই বন্ধক দেওয়া। কবি শপ্ত ঘোষ সম্ভবত এই চরিত্রের মানুষগুলোর অন্যই লিখে দিলেন সেই অমোঘ পঙ্ক্তি-
‘কে আপনি? কী চান?/ কিছু কি খুঁজছেন?/ মিহি স্বরে বলবেন তিনি/ মেরুদণ্ডখানা।’
শোষণের চেহারাটা আজ এক গোলকধাঁধা। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘শোষণ ছেড়ে যায়নি। আজ সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা করপোরেট সংস্থা-সর্বত্র কন্ট্রাকচুয়াল বা ক্যাজুয়াল লেবারের নামে এক আধুনিক ক্রীতদাস প্রথা চলছে। এমএ-বিএড করা শিক্ষিত যুবক থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী-সবাই ৫ থেকে ১২ হাজার টাকার এক চূড়ান্ত অবমাননাকর বেতনে খাটতে বাধ্য হচ্ছেন। একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে, যখন জিনিসের দাম ‘আকাশছোঁয়া’ নয় বরং ‘মহাকাশছোঁয়া’ শূন্যতাকে স্পর্শ করছে, তখন ওই সামান্য অর্থে একটি জীবন কীভাবে চলতে পারে? এই শোষণের রূপটি আরও বীভৎস হয়ে ওঠে যখন আমরা চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের দিকে তাকাই। কী অদ্ভুত এক কাঠামো, যেখানে মানুষের অসুস্থতাকেও বেতনের ফ্রেমে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মাইনের অঙ্কের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় কে সরকারি বা বিমা-সংক্রান্ত চিকিৎসার সুযোগ পাবে আর কে পাবে না। এই কারসাজি আসলে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এক সূচারু কৌশল।
এমনকি প্রান্তিক স্তরেও সিন্ডিকেট-রাজ এমনভাবে শিকড় গেড়েছে যে, সৎভাবে বাঁচার পথটুকুও বন্ধ। নিম্ন অসমের এক বাজারে এক যুবক সামান্য মিষ্টি বিক্রি করতে গিয়ে বড় ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়ে, কারণ সে কম দামে সুস্বাদু মিষ্টি দিয়ে বাজারের একচেটিয়া মুনাফায় টান দিয়েছিল। পৌরসভায় দরখাস্ত পড়ে তাকে উচ্ছেদ করার জন্য। শোষণের এই যে ‘চক্র’, তা প্রমাণ করে যে আমরা আসলে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষের চেয়ে মুনাফা বড়। এই ভয়াবহ বিপন্নতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্র এবং বেসরকারি পুঁজি একজন মানুষের অস্তিত্বের রসটুকু শুষে নিচ্ছে। এই শোষণের অভিঘাতেই আজ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে আত্মহত্যার মিছিল বাড়ছে, ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে পারিবারিক ভাঙন আজ ঘরে ঘরে।
সাহিত্যিকরা এই যন্ত্রণার ছবি আঁকেন। প্রখ্যাত লেখক শঙ্কর তার ‘জনঅরণ্য’ উপন্যাসে লিখেছিলেন কীভাবে মধ্যবিত্তের নৈতিকতা বেকারত্বের চাপে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শঙ্করের সেই সোমনাথেরা আজও কেন একই হাহাকারে ফুটপাথে ঘুরছে? রাষ্ট্র কি এসব সাহিত্য থেকে বিন্দুমাত্র শিক্ষা নিয়েছে? প্রখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী তার ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসে বিরসা মুণ্ডার লড়াইয়ের মাধ্যমে বলেছিলেন-‘জল, জঙ্গল, জমির ওপর মানুষের অধিকার যদি রাষ্ট্র কেড়ে নেয়, তবে সেই রাষ্ট্র আসলে একটা জল্লাদ।’ তিনি কেবল কলম ধরেননি, শবরদের সঙ্গে মাটিতে বসে লড়াই করেছেন। এই প্রতিবাদের ধারায় শঙ্খ ঘোষও ছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী। তার ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কাব্যে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজ মানুষের সত্যিকারের মুখ ঢেকে দিচ্ছে। আবার ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’ কবিতায় তিনি যে ভণ্ডামির স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, তা আজকের এই ‘ইন্টেলেকচুয়ান ডংকি’দের ওপর এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত।
জেমস ক্যামেরুন যখন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তখন তিনি সে বিষয়ের অতল গহিনে ডুব দেন। ঠিক তেমনি একজন প্রকৃত সাহিত্যিক যখন প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লেখেন, তখন তিনি তাদের ঘামের গন্ধটা অনুভব করেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সেই যন্ত্রণার ফসলগুলো যখন ‘বেস্ট সেলার’ হয় বা বড় বড় পুরস্কার পায়, তখন সেই প্রান্তিক মানুষটার থালায় এক মুঠো অন্নও বাড়ে না। শির তখন কেবল শোষিত মানুষের যন্ত্রণার একটি ‘প্রদর্শনী’ (ঊীযরনরঃরড়হ) হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আজকের মিডিয়া বা মিডিয়া-বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদের চেয়ে প্রতিযোগিতায় বেশি বিশ্বাসী। তারা ‘দুঃখ’ বিক্রি করে টিআরপি (ঞজচ) বাড়াতে জানেন, কিন্তু সেই দুঃখ দূর করার জন্য নীতিনির্ধারকদের কলার ধরতে জানেন না।
আমার এ লেখাটি পড়ার পর আমাদের চেনা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মানুষগুলো হয়তো অভ্যাসবশতই একটি তকমা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কেউ হয়তো একে ‘বামপন্থি’ বা ‘ডানপন্থি’ রাজনীতির চশমায় দেখতে চাইবেন। তাদের উদ্দেশ্যে জানাই, আমি নিজেকে একজন ‘নারায়ণ ভক্ত নাগরিক’ হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। তবে আমার কাছে ‘নারায়ণ’ মানে কেবল মন্দিরের শান্ত ও মিষ্টভাষী বিগ্রহ নন; নারায়ণ হলেন সেই আদি-অনন্ত শক্তি যা নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি-যার ‘নারায়ণী সেনা’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক। নারায়ণ মানে সেই সকালের আলো যা শোষণের অন্ধকার ঘোচাতে বাধ্য। যারা আমার এই বিশ্বাসকে ঠাকুর-দেবতার ভক্তি বনে ছোট করতে চাইবেন, তারা নিজেদের কেবল ‘ইন্টেলেকচুয়াল ডংকি’ হিসেবেই প্রমাণ করবেন না, বরং তারা হবেন এই সময়ের ‘মোস্ট ইন্টেলেকচুয়াল ডংকি’। কারণ ভক্তি মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়, ভক্তি মানেই হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারায়ণের সেই রুদ্ররূপ ধারণ করা।
আমাদের প্রয়োজন আজ কোনো দলীয় দলাদলি নয়, প্রয়োজন কেরালা মডেলের মতো এক সুস্থ প্রশাসনিক সদিচ্ছা। শোষিত মানুষের হাহাকার যদি প্রশাসনের এসি-ঘরে কম্পন তৈরি করতে না পারে, তবে আমাদের এই ‘হাফ-সিভিলাইজড’ অস্তিত্বের পরাজয় কোনোদিন ঘুচবে না। শঙ্খ ঘোষের সেই মিহি স্বরে মেরুদণ্ড খোঁজার দিন শেষ হোক, এবার সময় এসেছে শিরদাঁড়া টানটান করে প্রশ্ন করার। সাহিত্য যদি জীবনের বদল না ঘটাতে পারে, তবে সেই অক্ষরগুলোর কোনো সার্থকতা নেই। কলম হোক সেই হাতুড়ি, যা এই পচাগলা ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়ে এক নতুন ভোরের সূচনা করবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, আসাম, ভারত
