বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩
তারাশঙ্কর ও বাঙালি সংস্কৃতি
১২৮ তম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধার্ঘ
জুলফিকার নিউটন
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২৭ এএম আপডেট: ১৬.০৯.২০২৬ ২:০১ এএম |

 তারাশঙ্কর ও বাঙালি সংস্কৃতি
‘বসুন্ধরা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিমানসের এক অপূর্ব স্বপ্নকামনার কথা বলেছেন। দেশ-দেশান্তরে সকলের ঘরে-ঘরে জন্ম নিয়ে সর্বলোকসনে স্বজাতি হয়ে থাকার ইচ্ছা সেখানে প্রকাশিত হয়েছে। ‘অরুগ্ন বলিষ্ঠ হিংস্র নগ্ন বর্বরতা’কেও তিনি ভালবাসতে চেয়েছেন। এমন কি অরণ্য-মেঘের তলে প্রচ্ছন্ন-অনল-বজ্রের-মত দীদ্ভোজ্জ্ল দেহ নিয়ে হিংস্র ব্যাঘ্র যখন বিদ্যুতের বেগে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তার সে অনায়াস-মহিমা, হিংসাতীব্র সে আনন্দ, সে দৃপ্ত-গরিমারও স্বাদ একবার নিতে তাঁর ইচ্ছা হয়েছে। এমনি করে বিশ্বের সকল পাত্র থেকে নব-নব স্রোতে আনন্দমদিরাধারা পান করার কবিকামনা ভাষা পেয়েছে এই অবিস্মণীয় কবিতায়। কিন্তু এই নির্বিশেষ জীবনরস-রসিকতা বিশ্বকবির কল্পনায় স্থান পেলেও তাঁর কবিজীবনের প্রত্যক্ষ অনুভবের মধ্যে সর্বাংশে সত্য হয়ে ওঠে নি। গোধুলি লগ্নের কাব্যে তাই তিনি অতৃপ্ত ক্ষোভের সঙ্গেই স্বীকার করে গেছেন, সমাজের উচ্চমঞ্চে সঙ্কীর্ণ বাতায়নে বসে বিপুলা এ পৃথিবীর ঐকতানে জীবনে যোগ করা সম্ভব হয় না।
বাংলা কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের উত্তর-সাধকগণ কিন্তু সমাজে উচ্চ-মঞ্চের সঙ্কীর্ণ বাতায়ন থেকে নেমে এসেছেন একেবারে মাটির বুকে। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের নগরে-প্রান্তরে শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ’ পরে যারা চিরকাল কাজ করে- দাঁড় টানে, হাল ধরে থাকে, মাঠে মাঠে বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে- তাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আজকের সাহিত্য। সাহিত্যের এই নিঃশব্দ পটপরিবর্তন এ যুগের এক পরমাশ্চর্য ব্যাপার। বাংলা কথাসাহিত্যের প্রথম দিকপাল বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য সমাজের উচ্চ-মঞ্চের অভিজাত-শ্রেণীরই সাহিত্য। রাজপুত ও নবাবদের ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে সমাজিক স্তরে নেমে আসার পরও তিনি পল্লীর অভিজাত- কুলের কথাই বিশেষ করে বলেছেন। ছোটগল্পের রবীন্দ্রনাথ ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,  ছোট ছোট দুঃখকথা, নিতান্তই সহজ সরল’ কাহিনীর মধ্য দিয়ে পল্লীজীবনের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখকে ভাষা দিয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর স্বাধিষ্ঠানক্ষেত্র প্রিন্স দ্বারকানাথা ঠাকুরের জোড়াসাঁকোর প্রাসাদ-মালায়। তাই রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস নাগরিক অভিজাতদের কথাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। শরৎচন্দ্রেই প্রথম ভিড় করে এল সাধারণ মানুষ। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ধারা অনুসরণ করে উপন্যাসে শরৎচন্দ্র মধ্যবত্তি সমাজের কাহিনীকেই উপজীব্য করলেন। তার পরে এল প্রথম যুদ্ধ ওর কল্লোল-কালিকলম-প্রগতি অধ্যায়। সাহিত্যের রাজপথে শুরু হল অভদ্র ইতর-জনের আনাগোনা। সমাজের সবচেয়ে নিচের তলার মানুষ- সারস্বত মন্দিরের নিষিদ্ধ-পথে প্রবেশের অধিকার পেল। নগরকেন্দ্রিক অভিজাত-সাহিত্য বিকেন্দ্রিত হল সুদুর পল্লীর অখ্যাতজনের মাটির কুটিরে। 
এমনি দিনের বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় দেখা দিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)। কৃষাণের জীবনের শরিক, কর্মের ও কথায় তাদের সত্যকারের আত্মীয়; শুধু মাটির কাছাকাছিই নন, একেবারে, মাটির বুক থেকেই উঠে এলেন তিনি। এল ‘চৈতালি-ঘূর্ণি’, ‘পাষাণপুরী’, ‘নীলকণ্ঠ’। স্ফয়িষ্ণু পল্লীর দারিদ্রলাঞ্ছিত, ব্যাধিগ্রস্ত জীবনের চিত্র পরিস্ফুট হয়ে উঠল সাহিত্যে। কিন্তু শুধু খণ্ডচিত্রেই নয়, সমগ্র-ভাবেই তিনি পল্লীবাংলার রূপ প্রত্যক্ষ করলেন। শুধু তার দারিদ্র ও দীনতাই নয়, তার ঐশ্বর্য ও মহিমাকেও তিনি আবিষ্কার করলেন। এ দিক দিয়ে তাঁর ‘জলসাঘর’ বাংলা গ্রাম-জীবনের এক অনাবিষ্কৃত মহলের রুদ্ধদ্বার উদ্ঘাটন করল। জলসাঘরে সামাজিক ইতিহাসের এক বিলীয়মান স্বর্ণদিগন্ত। যে রাজোচিত ঐশ্বর্য একদিন বাংলার জীবনে একান্ত সত্য ছিল, তারই অস্তরশ্মি হৃতসর্বস্ব বাঙালির চোখে এক অবোধপূর্ব বিস্মৃত-স্বপ্নের অঞ্জন পরিয়ে দিলো। অল্পদিনে ব্যবধানেই তারাশঙ্কর লিখলেন ‘ধাত্রীদেবতা’ ও ‘কালিন্দী’।  এবার বাংলা তথা ভারতের সামন্ত্রতান্ত্রিক-সমাজের চিত্র পুর্ণাঙ্গ হয়ে উঠল। সসাগরা পৃথিবী বিষয়ে বেরিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা যে স্বর্ণপ্রসবিনী ভারতভূমিতে পদার্পণ করেছিল এই তো ছিল তার সমাজের গড়ন। এ সমাজ একান্তভাবেই সামন্ততান্ত্রিক। ভূস্বামী বা জমিদারেরাই তার সার্বভৌম অধিপতি। সমাজের সর্বস্তরেই তাঁদের অপ্রতিহত প্রভাব। তাদের জীবনকে কেন্দ্র করেই সমাজ-জীবন স্পন্দিত ও আবর্তিত হয়েছে। ভারতে ব্রিটিশ-আধিপত্যের সঙ্গে-সঙ্গে এই সব পল্লীসম্রাটের সামনে এসে দাঁড়াল ধনগর্বিত নাগরিক শ্রেষ্ঠী। বাধল সম্রাট ও শ্রেষ্ঠীর সংঘাত। সে সংঘাতে নবোদিত ধনিক-শক্তির হাতে ঘটল সামন্ততন্ত্রের পরাজয়। সাম্রাজ্যবাদী বণিকের উদ্ধত রথচক্রতলে বাংলার সমাজ-জীবনের প্রাণকেন্দ্র গুঁড়িয়ে যেতে লাগল। ভেঙে পড়ল বাংলার পল্লীসমাজ। বিদেশীয় পণ্যশালার ঐশ্বর্যগর্বে একদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল নগরের প্রাসাদমালা, অন্যদিকে পরাজয়ের চরম-গ্লানি বহন করে অনিবার্য ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলল বাংলার গ্রামীণ সভ্যতা। এতদিন বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত ছিল নবগঠিত নাগরিক জীবনের সুখদুঃখের মধ্যে। কিন্তু দুশো বছরের বিদেশী-শাসনের অভিশাপ যে আমাদের এই গ্রামে-গাঁথা দেশের ভিত্তিমূল পর্যন্ত ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, সে সর্বনাশের দিকে প্রবুদ্ধ দৃষ্টির অভাব ছিল। তারাশঙ্করের রচনা এই ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক বাংলার শেষ-দীর্ঘনিঃশ্বাসে অশ্রুসজল।

আধুনিক যুগে আঞ্চলিক সাহিত্যের পথিক্বৎ হলেন শৈলজানন্দ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করে আঞ্চলিক সাহিত্য ব্যাপকতা ও পূর্ণতা পেয়েছে। উত্তর রাঢ়ের মাটি ও সমাজ ঐ অঞ্চলের মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গে মিশে তাঁর রচনায় অবিনশ্বর হয়ে উঠেছে। কিন্তু ‘কালিন্দী’ পর্যন্তও তাঁর দৃষ্টি ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ‘গণদেবতা’ ও ‘পঞ্চ গ্রাম’-এ তিনি শুরু করলেন সাহিত্যের নতুন অধ্যায়। একটি বিরাট জনপদের পটভূমিতে  সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সামগ্রিক জীবনের রূপ উপন্যাসের বিপুল আয়তনে পরিস্ফুট হয়ে উঠল। বৈচিত্র্যের, বিশালতায় ও সামগ্রিকতায় তা মহাকাব্যের সঙ্গেই  তুলনীয়। রাঢ়ের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তারাশঙ্করের অন্তরঙ্গ পরিচয় ও নিবিড় আত্মীয়তার ফলে বাংলার এই বিশেষ অঞ্চলের ভৌগোলিক রূপও এক অভিনব রসমূর্তি নিয়ে সাহিত্যে দেখা দিয়েছে। সমাজতন্ত্রের সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বর্ণনা এবং সামাজিক ইতিহাসের উত্থান-পতনের কাহিনীও রসের সামগ্রী হয়ে উঠেছে। বস্তুত তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম’ বাংলার পল্লীজীবনের মহাকাব্য। তারও পরে ‘পদচিহ্ন’এর পথ ধরে তিনি আমাদের কথাসাহিত্যেকে যেখানে পৌঁছে দিলেন সেখানে ব্যক্তিবিশেষের সুখদুঃখ নয়, এক বিপুলাতন জনপদের লক্ষ মানুষের জীবনের কলধ্বনি তাতে শোনা যাচ্ছে। মাটির গন্ধ ও ঘ্রাণ এসেছে সাহিত্যে। প্রকৃতির প্রাণলীলার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ও অবিচ্ছিন্নভাবে গ্রথিত হয়ে নতুন রূপ খুলেছে মানুষের। সাহিত্যের স্বাদ গিয়েছে বদলে। বাংলা সাহিত্যে তাই তারাশঙ্কর এক নতুন অধ্যায়।
কিন্তু তাঁর জীবনান্বেষণ ক্ষান্তিহীন। তিনি ক্রমশই সমাজ-জীবনের আরো নিুে আরো গভীরে তলিয়ে গিয়েছেন। ব্রাহ্মণ্য সমাজের উদার আমন্ত্রণের ফলেও যে-সব ব্রাত্য ও গোত্রহীন মানুষকে সমাজ-গণ্ডীর ভিতরে আনা সম্ভব হয় নি, অথচ যারা এই দেশেরই বুকে যুগ যুগ ধরে লালিত হচেছ, তাদের আদিম অসংস্কৃত প্রকৃতি নিয়ে একেবারে মাটির সঙ্গেই মিশে আছে, তাদেরও তিনি সাহিত্যের আঙিনায় আহ্বান করেছেন। ডোম-বাউরী, বাগদী-কাহার, বেদে-সাঁওতালেরা এই নতুন সাহিত্যের নায়ক হয়েছে। ‘হাঁসুলী-বাঁকের উপকথা’-য় তাদের অন্ত্যজ-জীবনের সঙ্গে রসিকজনের আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিপুলা এ পৃথিবীর ঐকতানে জীবনে জীবন যোগ করার কবিস্বপ্ন চরম সার্থকতায় মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে।
তারাশঙ্করের সাহিত্যে এই আপামর মানবসাধারণের আবির্ভাবের মূলে একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর সামগ্রিক জীবনবোধ, অন্যদিকে তেমনি আছে মানবের জীবনমহিমার প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি। সহজ-সাধনের কবি চণ্ডীদাস একদিন যে প্রসঙ্গে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’-এই মতবাদ প্রচার করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গকে অক্ষুন্ন রেখে তারাশঙ্করের সাহিত্য সম্পর্কেও বলা চলে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। মানুষেরই ‘জীবন সর্বকালে সাহিত্যের উপজীব্য হলেও জীবন সম্পর্কে শিল্পীর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই সাহিত্যে মানুষের নতুন পরিচয়, জীবনের নতুন মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। বাংলার কথাসাহিত্য একশ বছর সম্প্রতি অতিক্রম করেছেন, কিন্তু এরই মধ্যে শিল্পীর দৃষ্টিবদলের ফলে জীবনের মূল্যবদলের চিহ্নও তার মধ্যে সুপরিস্ফুট। বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনামূলে ছিল জীবনের শিল্পচেতনা। এই শিল্পবোধের ভিত্তিতে ন্যায়-অন্যায়, নীতি-দুর্নীতির মাপকাঠিতে গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনমূল্য। তাই তাঁর কল্পনায় প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে ‘নৈতিক মানুষ’ বা অংঃযরপধষ সধহ। রবীন্দ্রনাথের জীবনস্বপ্নে ধরা পড়েছে সুন্দরের লীলা। তিনি আবিষ্কার করলেন ‘রসিক মানুষ’ বা অবংঃযবঃরপ সধহ কে। শরৎচন্দ্রের কল্পনামূলে আছে ‘প্রেমিক মানুষ’ বা বসড়ঃরড়হধষ সধহ। শরৎ-পরবর্তী শিল্পিমানস দেখেছে জৈবিক মানুষকে, অর্থনৈতিক মানুষকে জেনেছে-এই উভয়েরই সংমিশ্রণে সামাজিক মানুষের সত্তা। বঙ্কিমচন্দ্র নৈতিকতার শক্ত দেওয়াল গেঁথে আদর্শ মানবতার যে-মন্দিরে মানুষের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন, রবীন্দ্রনাথই প্রথম সে মন্দিরের দেওয়ালে আঘাত হানলেন তাঁর ‘নষ্ট-নীড়’, আর ‘চোখের বালি’তে। নীতির দেওয়াল ভেঙে পড়ল, বড় হল সৌন্দর্যবোধ। মানুষের আচার-আচরণে সুন্দর-অসুন্দরের বিচারই প্রধান হয়ে উঠল। রসিক-মানুষের হল জয়। শরৎচন্দ্র এলেন আর একটু এগিয়ে। ‘ভাবে অবশ হৈয়া, হরি হরি বোলাইয়া’ তিনি ‘আচণ্ডালে প্রেম’ বিলিয়ে দিলেন। সুন্দর-অসুন্দরের মাপকাঠি তিনি মানলেন না, প্রেমের দৃষ্টিতে সুন্দর-অসুন্দরের ভেদাভেদ নেই-প্রেম অসুন্দরকেও সুন্দর করে। তাঁর দৃষ্টিতে তাই মেসের ঝি সাবিত্রীর প্রণয়াকর্ষণও শ্রদ্ধা পেল, শ্রদ্ধা পেল বারবধু চন্দ্রমুখী আর পিয়ারী বাইজী। কিন্তু যে প্রেমকে মহিমান্বিত করে শরৎচন্দ্রের জীবনকল্পনা, আধুনিক যুগ সে প্রেমেরই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে খুঁজে পেল মানুষের জৈব প্রবৃত্তিকে। যে দুটি আদিম প্রবৃত্তির বশে মানুষের জীবজীবন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে- তার সমস্ত সুখদুঃখ ও আচার-আচরণের মূলে সেই প্রবৃত্তিদ্বয়েরই বিশ্ষেণ মুখ্য হয়ে উঠল এ যুগের সাহিত্যে। 
তারাশঙ্কর জীবনে এই প্রবৃত্তির লীলাকে স্বীকার করেন। এই প্রবৃত্তিরই আকার ও প্রকারভেদে ব্যক্তির স্বভাব ও চরিত্রের মধ্যে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়, বিভিন্ন দেহের পাত্রে জীবনের বিচিত্র রস ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে ও বর্ণে সঞ্চিত ও ক্ষরিত হতে থাকে। কিন্তু তারাশঙ্করের দৃষ্টি জীববিজ্ঞানীর দৃষ্টি নয়, জীবনসত্য তাঁর কাছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে তাঁর তৃতীয় নয়নের সম্মুখে এক রহস্যময় উন্মেষণ-লীলার মধ্য দিয়ে। তাঁর প্রার্থিব-দৃষ্টিতে সকল জীবনের মধ্যেই তিনি একই দুজ্ঞেয় জীবনীশক্তির রহস্যলীলা প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রবৃত্তিরূপে প্রকাশিত মানুষের জীবনে এই জীবনীশক্তিকেই তিনি পূর্ণস্বীকৃতি দিয়েছেন। এই স্বীকৃতি ভাল-মন্দ, শুচি-অশুচি, সুন্দর-অসুন্দরের সমস্ত খণ্ডিত চেতনার ঊর্ধ্বে। যাকে সুন্দর বলি তাও যেমন এই শক্তিরই লীলা, যাকে বীভৎস বলি তার মধ্যেও এই একই শক্তির প্রকাশ। মধুরে ও মনোহরে যেমন এই শক্তি, ভীষণে ও ভয়ানকও এই একই শক্তি। সর্বঘটে এই শক্তির লীলাকে স্বীকার করে নিলে জীবনে বর্জনীয় আর কিছুই থাকে না। তারাশঙ্করের সাহিত্যের এই অখণ্ড মানবজীবনই স্বমহিমায় প্রকাশিত। ভালমন্দ-বোধের ব্যক্তি-সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি জীবনকে তার আপন স্বরূপে উদ্ঘাটিত করেছেন। এই সর্বাত্মক জীবন-রস-রসিকতাই তারাশঙ্করের সাহিত্যকে বিশিষ্টতা দান করেছে। এবং এ কারণেই তাঁর হাতে কোমলে কঠোরে বিচিত্র রসপরিবেশন সম্ভব হয়েছে। এ দিক দিয়ে শরৎচন্দ্র থেকে তারাশঙ্করের সাহিত্যে কি বিপুল পরিবর্তন! শরৎচন্দ্র কেবল কোমল, কেবল মধুর। জীবনের রসতীর্থে তিনি বৈষ্ণব-পন্থী। তাই বাৎসল্য ও মধুর রসই তাঁর সাহিত্যের মুখ্য রস। তারাশঙ্করে চিত্তবৃত্তি নয়, মানুষের ধাতুপ্রবৃত্তিরই দুর্দমনীয় বিকাশ। তাই তাঁর রচনায় মধুর ও করুণ-রসের সঙ্গে রৌদ্র, ভয়ানক, এমন কি বীভৎস-রসও সমান মর্যাদা পেয়েছে। শরৎচন্দ্রের জীবনে রাধিকামূর্তিরই আরাধনা, তারাশঙ্করের আরাধ্যা জীবনের বিভীষণা নগ্নিকা কালিকামুর্তি। 

তারাশঙ্করের সাহিত্যে প্রবৃত্তিই মানুষের নিয়তি। এই প্রবৃত্তির হাত থেকে মানুষের মুক্তি নেই, অমোঘ নিয়তির অনিবার্য পরিণামকেও এড়িয়ে যাবার কোন শক্তি নেই তার। এই প্রবৃত্তিরূপিণী নিয়তির কাছে মানুষের অসহায়তাবোধের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যের ট্রাজেডির স্বরূপ-লক্ষণ নিহিত। জীবনে সে-নিয়তির লীলা কখনো পরিদৃশ্যমান, কখনো অপরিজ্ঞেয়। কখনো তা কার্যকারণ-পরস্পরায় গ্রথিত, কখনো একেবারেই জীবনরঙ্গমঞ্চের কৃষ্ণ-যবনিকার অন্তরালবর্তিনী। তারাশঙ্করের দৃষ্টি জীবনের অতলান্ত গভীরতায় তলিয়ে এই নিয়তি-নিয়ন্ত্রিত চিরন্তন জীবন-রহস্যেরই সন্ধান করেছে। বিশ্লেষণ নয়, ব্যাখ্যান নয়- রহস্যের গ্রন্থিমোচনমাত্র। এই গ্রন্থিমোচনই জীবনশিল্পীর চিরকালের চেষ্টা। জরা-ব্যাধি-মৃত্যু-কবলিত জীবনে যে মহাভয় মানুষের নিত্যসঙ্গী মানব-সাধারণের অনিবার্য পরিণাম প্রত্যক্ষ করে হতভাগ্য মানুষের প্রতি পরম-করুণায় বিগলিত হয়ে সেই মহাভয়কে জয় করার সাধনাই সর্বকালের মহৎ সাহিত্যের সাধনা। তারাশঙ্করের সাহিত্য এই মহৎ সাহিত্যের লক্ষণাক্রান্ত। 
তারাশঙ্করের ‘ইমারত’ ও ‘কামধেনু’ গল্প দুটিতে এই অবিনশ্বর বাংলার জীবনরহস্য সাধারণ মানুষের অতি-নগণ্য জীবনের মধ্যেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বাঙালি প্রকৃতির প্রতীক হল বটগাছ আর বাঙালি সংস্কৃতির বুনিয়াদ যে কৃষিসভ্যতা তার প্রতীক হল কামধেনু। এদেশের প্রকৃতিপালিত জীবনে বটগাছ যে কত সুখদঃখের সাক্ষী হয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই! আর স্তন্য-পীষূষ-দায়িনী সুরভির সেবা ও তার মহিমা নিয়ে এদেশের কত আখ্যান-উপাখ্যানই না গড়ে উঠেছে! তারাশঙ্করের ‘ইমারত’ ও ‘কামধেনু’ বাংলা-কথার এই দুটি চিরন্তন ধারা থেকেই উদ্ভুত। রাজমিস্ত্রী জনাব আলি ‘ইমারত’-এর নায়ক। সে সারাজীবন নিজের হাতে গড়েছে কত মন্দির আর মসজিদ, কত সুন্দর সুন্দর গম্বুজ আর মিনার। কিন্তু তার জীবনের যখন অন্তিম লগ্ন এসে উপস্থিত, তখন দেখা গেল তার রোগজর্জর জরাতুর দেহকে আশ্রয় দেবার জন্যে একটি ভাঙা কুঁড়েও তার ভাগ্যে জুটল না। জনাব আলি জানে, এ তার পাপেরই ফল। মেয়েদের সম্পর্কে সে উচ্ছৃঙ্খল, সে ব্যভিচারী! ‘অহরহ কাজকামের সময় যারা পাশে থাকে, হাতে হাত লাগে, চোখে চোখ রাখতে হয়,... ভারার উপর কড়া রোদে মাথা ঘুরে গেলে যারা বাতাস দেয় আঁচল দিয়ে, তাদের উপর দিল্ না পড়ে উপায় কি?’ জনাবেরও উপায় ছিল না। কিন্তু এই এক পাপ ছাড়া তার আর কোনো পাপ নেই; তবু কি নিদারুণ প্রায়শ্চিত্তই না তাকে করতে হল! কিন্তু খোদাতায়লার দরবারের ক্ষমাও সে পেয়েছে। মানুষের গড়া সমস্ত আশ্রয় থেকে যখন সে বঞ্চিত তখন খোদাতায়লার নিজের হাতে গড়া ইমারতের তলায়ই সে স্থান পেল। আশ্রয় পেল সে বটগাছের তলায়। বটগাছ ঈশ্বরের গড়া ইমারত-এই কল্পনার মধ্যে যেমন কবিত্বশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি লেখকের শিল্পিমানস যে কি ভাবে বাঙালি প্রকৃতি ও বাঙালি ঐতিহ্যের মধ্যে অনুবিষ্ট হয়ে রয়েছে তারও আভাস এই একটিমাত্র বস্তুপ্রতীকের মধ্যেই সুপরিস্ফুট। মানুষের গড়া সমাজের আশ্রয় চ্যুত হয়ে যে মুহূর্তে এই হতভাগ্য মানুষটি বটগাছের তলায় নেমে এল, সেই মুহূর্তে একটি ক্ষুদ্র জীবনের তুচ্ছ কাহিনী সমস্ত বাংলার সনাতন পটভূমিতে বিন্যস্ত হয়ে তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠল। অভিনগণ্য ব্যক্তিজীবনের রহস্যের মধ্যে বিরাটতম জীবনসত্যের উপলদ্ধির ব্যঞ্জনায় গল্পটি অসাধারণ তা ছাড়া গল্পের উপসংহারে বাঙালির আস্তিক্যবুদ্ধিই জয়যুক্ত হয়েছে। ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতাশীলতার ওপর অটুট বিশ্বাস রেখে তাঁর কাছে পূর্ণ-আত্মসমর্পণেই এই প্রাণান্তকর দুঃখ-কথা মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। 
‘কামধেনু’ গল্পে লক্ষ্মী আর উর্বশী, কল্যাণ আর কামনা, সেবা আর প্রলোভনের দ্বন্দ্বে বাঙালি জীবনবোধেরই প্রকাশ। গল্পে কামধেনু আত্ম-প্রকাশের বর্ণনা অতুলনীয়। ‘আশ্বিন মাসের আকাশের সাদা মেঘের মত নরম আর সাদা... গায়ে হাত দিলে মনে হয়, কোনো কচি দেবকন্যার অঙ্গে বা হাত পড়ল। .... যখন যুবতী হয়ে ওঠে, সর্বাঙ্গ ভরে ওঠে পুষ্টিতে, চিকনতর লোমে, গলার গলকম্বল প্রশস্ত হয়ে ঝুলে পড়ে, মন মোহিত করে দুলতে থাকে, পিছন দিকটি ক্রমশ ভারী হয়ে উঠে থমকে থমকে চলে।.... সন্তান প্রসব করে না, অথচ প্রবালের মত রক্তিম আভায় এবং একরাশি পদ্ম-ফুলের মত পেলবতায় অপরূপ লাবণ্যে মণ্ডিত হয়ে তার স্তনভাণ্ড স্ফীত হয়ে ওঠে, পাকা বিম্বফলের মত পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে স্তনবৃন্তগুলি; প্রথমে বিন্দু বিন্দু দুধ দেখা দেয় স্তনবৃন্তের মুখে, তারপর ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ে মাটিতে।’
পটুয়ার ছেলে নাথু। ধর্মে মুসলমান, আচরণে হিন্দু, জীবিকায় শিল্পী। এই নাথুর জীবনেই আবির্ভূত হলেন কামধেনু। বংশ-বংশ ধরে নাথুরা ঘরে ঘরে ‘সুরভিমঙ্গল-গান গোধন মহিমা’ গেয়ে গেয়ে যে পূণ্য অর্জন করেছিল তারই ফলে এই বংশে কামধেনু আবির্ভূতা হলেন। নাথু মা-সুরভির সেবায়, তাঁরই আশীর্বাদে সৌভাগ্যের অধিকারী হল। কিন্তু তার জীবনে সর্বনাশের অগ্রদুতী হয়ে এল ফুলমনি। তার ‘মুনিজনের মন-ভোলানো’ রূপে প্রলুদ্ধ হল নাথু। লক্ষ্মীকে বিসর্জন দিয়ে উর্বশীকে বরণ করলো সে। কামধেনুকে এক ধনীগৃহে বিক্রয় করে ফুলমণিকে ভোগ করার অর্থ সংগ্রহ হল তার। কিন্তু দুদিনের মধ্যেই এল অনুশোচনা। মতিভ্রান্ত নাথু কামধেনুকে হত্যা করলো। ফুলমণিও তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। হেফাজদ্দি শেখের কাছে তাকে বিক্রয় করে সেই টাকাতেই নাথু শুরু করলো চামড়ার ব্যবসা।  কামধেনুর সেবক হল গোচর্মের ব্যবসায়ী। কিন্তু এই শোচনীয় অধঃপতনের মধ্যেও নাথুর জীবনে ফুলমণি নয়, কামধেনুরই প্রভাব অন্তঃসলিলা ফল্গুর মত চিরবহমান। তাই চর্মব্যবসায়ীর সম্মুখে একদিন একটি গোহত্যাকারী আসতেই সে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যা করলো তাকে। গোধনকে যে বিনাশ করে তার শাস্তি যে নাথুর রক্তের মধ্যে। বলাই বাহুল্য, এই নর-হত্যা আত্মহত্যারই নামান্তর। নরহত্যার অপরাধে নাথুর ফাঁসির আদেশ হল। ফাঁসিতে তার দুঃখ নেই। গোহত্যাকীরীকে মেরে ফাঁসি যেতে কোনো আক্ষেপ নেই। তবে ফাঁসির দড়িটা গরুর আঁতে তৈরি হলেই তার আর কোনো খেদ থাকে না। 
এ-গল্পে বাঙালি-সংস্কৃতি স্পর্শ করেছে একেবারে স্তরকে। কিন্তু জনজীবনের নিম্নতম স্তরেও বাংলার বাণীমৃর্তিটিকে নিচতে পারা যায়। মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘রঘুবংশ’ মহাকাব্যে বাংলার শ্রেষ্ঠ নরপতিকূলের উত্থান-পতনের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। কামধেনুর সেবা-মাহাত্ম্যে যে মহা-বংশের উত্থান, অগ্নিবর্ণের অমিতাচার ও উঁচ্ছৃঙ্খলতার ফলেই তার চরম অধঃপতন ঘটেছিল। সূর্যপ্রভব মহাবংশের উত্থান-পতনে প্রাচীন বাংলার মহাকবি যে জীবনসত্যকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, অবজ্ঞতা-পল্লীর অখ্যাতজনের প্রাকৃত-জীবনেও সেই এই জীবনরহস্য সমুদ্ভাসিত;- তারাশঙ্করের এই দৃষ্টিই আপামর সর্বসাধারণের জীবনে বাংলাকে নতুন মহিমায় আবিষ্কার করেছে।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২