কুবি সংবাদদাতা: বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে আকাশে জমেছে নীলের বিস্তার। বাতাসে নেই আর টানা বৃষ্টির সেই চিরপরিচিত গন্ধ। প্রকৃতির আনাচে-কানাচে ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে ঋতু বদলের খবর। মাঠের ধারে, পথের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সাদা কাশফুল। হাওয়ার দোলায় একসঙ্গে দুলছে অসংখ্য কাশের শিষ; মনে হচ্ছে, সবুজের বুকজুড়ে কেউ যেন সাদা তুলোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতি সেজেছে শুভ্রতার নতুন সাজে। কৃষ্ণচূড়া, সোনালু আর জারুলের রং পেরিয়ে এবার পাহাড় ঘেরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সেজেছে কাশফুলের সাদার মায়ায়।
ক্যাম্পাসের ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়জুড়ে ফুটে থাকা কাশফুল জানান দিচ্ছে শরতের আগমনি বার্তা। বাতাসে দুলতে থাকা সাদা মঞ্জুরি আর চারপাশের সবুজের মেলবন্ধনে বদলে গেছে ক্যাম্পাসের চেনা দৃশ্যপট। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই তুলির আঁচড়ে লালমাটির ক্যানভাসে এঁকে দিয়েছে সাদার এক নতুন ছবি।
প্রতিটি ঋতুতেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যেন ধারণ করে ভিন্ন এক রূপ। কখনো কৃষ্ণচূড়ার আগুন রাঙা সৌন্দর্য, কখনো সোনালুর হলুদ, কখনো জারুলের বেগুনি আর এবার সেই রঙের ভিড়ে যোগ হয়েছে শরতের সাদা। কাশফুলের এই শুভ্রতায় মুগ্ধ ক্যাম্পাসের বাসিন্দারা; শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সবার চোখেই এখন কুবির নতুন এই রূপ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পেছনের অংশ, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের চারপাশ, কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের ছোট ছোট টিলা, বাস্কেটবল কোর্ট, বিজয়-২৪ হলের আশপাশ ও গেস্ট হাউজের পাহাড়ে দেখা মিলছে কাশফুলের অপূর্ব সৌন্দর্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনে এমন দৃশ্য শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করে এক ধরনের স্বস্তির জায়গা। ক্লাসের চাপ, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা কিংবা সাংগঠনিক ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিটের জন্য কাশফুলের পাশে দাঁড়ানো যেন এনে দেয় মানসিক প্রশান্তি।
বিশেষ করে বিকেলের দিকে কাশফুলের সৌন্দর্য হয় চোখে পড়ার মতো। সূর্যের নরম আলো যখন সাদা কাশের ওপর পড়ে, তখন পুরো পরিবেশে তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। ক্যাম্পাসের চেনা জায়গাগুলোও তখন মনে নতুন পরিচয়ে চেষ্টা করছে সবার সামনে প্রতীয়মান হওয়ার।
দূর থেকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের বুকের মধ্যে সাদা কাশের সারি। একটু জোরে বাতাস বইলেই একসঙ্গে দোলে ওঠে মঞ্জরিগুলো। বিকেলের নরম আলোয় সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়। ক্যাম্পাসের চেনা জায়গাগুলোও তখন যেন ধরা দেয় নতুন করে।
তবে এবারের কাশফুলের গল্পে রয়েছে কিছুটা আক্ষেপও। ক্যাম্পাসের কাশফুলের পরিসর হয়েছে এবার কিছুটা সংকুচিত। খেলার মাঠের পাশে বাস্কেটবল কোর্ট ও ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কাশফুলের অন্যতম পরিচিত আবাসস্থল মাঠের ডান পাশের পাহাড়ের বড় একটি অংশে এবার ফুল ফুটতে দেখা যায়নি। ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় কাশফুলের বিস্তৃতি কমেছে। তবুও যেখানে কাশফু ফুটেছে, সেখানেই প্রকৃতি নিজেকে সাজিয়েছে নিজের মতো করে শরতের সাজে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার দিয়া বলেন বলেন, “ক্যাম্পাসে কাশফুল ফুটলে পরিবেশটাই অন্যরকম হয়ে যায়। ক্লাসের ব্যস্ততার মাঝেও একটু সময় বের করে এখানে এসে বসতে ভালো লাগে। মনে হয়, শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে চলে এসেছি।”
বর্তমান সময়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সেটিকে ক্যামেরায় ধরে রাখাও শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই তালিকা থেকে। সেই তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে না কুবির কাশফুলও। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি, একক ছবি কিংবা ক্যাম্পাসের প্রকৃতির ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা মুহূর্ত। ফলে কাশফুল শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না, হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের স্মৃতি ধরে রাখার একটি মাধ্যমও।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীর সুমাইয়া রিক্তি বলেন, "কাশফুল শুধু শরতের সৌন্দর্য নয়, এটি নগর জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের মানসিক প্রশান্তির এক বড় উৎস। ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক শহরে কাশবনে দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। বাতাসের দোলায় দোল খাওয়া এই সাদা ফুলের সারি যেন আমাদের শেখায়-সব কোলাহল ভুলে কীভাবে সহজ-সরল ও স্নিগ্ধ থাকা যায়।"
বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা। ছেলেরা ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলতে মাঠে আসে। মাঠজুড়ে খেলাধুলার ব্যস্ততার পাশেই কিছু দূরে বাতাসে দুলতে থাকে সাদা কাশফুল। একদিকে খেলোয়াড়দের দৌড়ঝাঁপ, অন্যদিকে নীরবে দোলতে থাকা কাশফুল।
বাংলা সাহিত্যেও শরৎ ও প্রকৃতি বারবার ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতিচেতনায় শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়, বরং নির্মলতা, আলো ও অনুভূতির এক বিশেষ সময়। তাঁর 'আজি শরৎ-তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরান কী যে চাই' এই পঙ্ক্তির অনুভূতিটি যেন শরতের মনের কথা বলে। শরৎ এলে মানুষের মনও অকারণে কিছু একটা খুঁজতে থাকে। কী হারিয়েছি, কী ফিরে পেতে চাই তার স্পষ্ট উত্তর থাকে না।
জীবনানন্দ দাশের বাংলা ও এমন এক প্রকৃতির বাংলা, যেখানে মাঠ, ঘাস, নদী, পাখি আর ঋতুর পরিবর্তনের মধ্যে মিশে থাকে স্মৃতি ও মায়া। আর কাজী নজরুল ইসলামের প্রকৃতিপ্রেম প্রকৃতি হয়ে উঠে প্রাণবন্ত ও গতিশীল। এই সাহিত্যিকদের কাছে প্রকৃতি কখনো শুধু দৃশ্য নয়; মানুষের অনুভূতি ও জীবনবোধেরও অংশ।
কাশফুলের সঙ্গে বাঙালি শৈশবের সম্পর্কটিও গভীর। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীতে দুর্গা ও ছোট ভাই অপু কাশবনের ভেতর দিয়ে ছুটে যায় ট্রেন দেখতে। কাশের সাদা ঢেউ পেরিয়ে তাদের সেই ছুটে চলা যেন গ্রামবাংলায় শৈশবের নির্মল কৌতূহলকে ধারণ করে।
ট্রেনটি শুধু একটি ট্রেন নয়; ছোট্ট অপু -দুর্গার কাছে সেটি ছিল পরিচিত পৃথিবীর বাইরে থাকা বিশাল অজানা জগতের একটি ইশারা। আর কাশবনের ভেতর দিয়ে সে ছুটে চলা হয়ে ওঠে প্রকৃতি, শৈশব, বিস্ময় ও স্বপ্নের এক অনন্য দৃশ্য।
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী আরিয়ান শাহীন বলেন, " কুবির পথে আজ কাশফুলেরা যেন পুরোনো কোনো গল্প বলে, শরতে সাদা মেঘে মিশে যায় কত না বলা অনুভূতি। এই ক্যাম্পাস শুধু স্মৃতির ঠিকানা নয়, হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক টুকরো ভালোবাসা, যেখানে কাশফুল দোলে, আর মনটা বারবার ফিরে যেতে চায়।"
শরৎ একদিন চলে যাবে। কাশফুলও ঝরে পড়বে। তবুও নতুন দিনের শরতের বাতাসে দুলতে থাকা একটি সাদা কাশফুল ফিরিয়ে দেবে সেই পুরোনো দিনে। সেদিন হয়ত আবার মনে হবে, জীবন সাহিত্য শরতের মেঘের মতো। আসে, কিছুক্ষণ থাকে, তারপর চলে যায়। কিন্তু রেখে যায় কিছু স্মৃতি। শরতের সেই সাদা চিঠি এখন কুবির সবুজ ক্যাম্পাসে, প্রতিটি দোলায় লেখা হচ্ছে তারুণ্য, প্রকৃতি আর স্মৃতির নতুন গল্প।
