শনিবার ২২ আগস্ট ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
যোগ্যতার অপচয়, উচ্চশিক্ষার সংকট ও রাষ্ট্রের দায়
নাঈমুল মাসুম
প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ এএম আপডেট: ২২.০৮.২০২৬ ১২:৫৫ এএম |

 যোগ্যতার অপচয়, উচ্চশিক্ষার সংকট ও রাষ্ট্রের দায়
পত্রিকার একটি ছোট খবরও কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে ভাবায়। সম্প্রতি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস-সহায়ক পদে নিয়োগের সংবাদটি পড়ে আমার ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। প্রথমে ভালো লেগেছিল, অন্তত একটি সরকারি নিয়োগকে ঘিরে অনিয়ম, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়নি। আমাদের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু সংবাদটি দ্বিতীয়বার পড়ার পর মন অন্য একটি প্রশ্নে আটকে গেল? এসএসসি পাস যোগ্যতার একটি পদে প্রকৌশলী, এমবিএ এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা কেন আবেদন করবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা, শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা এবং উন্নয়ন-ভাবনার একটি নীরবসংকট। তাই পাবনার ঘটনাটিকে আমি একটি বিচ্ছিন্ন নিয়োগের খবর হিসেবে দেখি না; বরং এটি এমন একটি আয়না, যেখানে আমরা একই সঙ্গে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তও দেখি, আবার একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখিও দাঁড়াই।
প্রথমে ইতিবাচক দিকটির কথা বলি। জেলা প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক। সরকারি নিয়োগ নিয়ে যেখানে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, সেখানে অভিযোগহীন একটি নিয়োগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এমন উদ্যোগ কেবল একটি জেলার সাফল্য নয়; এটি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ হয় না। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও বড় প্রশ্ন। একজন প্রকৌশলীকে তো সেতু নির্মাণ, শিল্পকারখানা কিংবা প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করার কথা। একজন এমবিএ ডিগ্রি ধারীর দক্ষতা ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় কাজে লাগার কথা। একজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও আমরা গবেষণা, বিশ্লেষণ কিংবা বিশেষায়িত পেশায় অবদান প্রত্যাশা করি। অথচ তাদের কেউ যদি অফিস-সহায়কের পদে যোগ দিতে আগ্রহী হন, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি ব্যক্তির নয়; সমস্যাটি ব্যবস্থার।
আমি এই তরুণদের সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করতে পারি না। কারণ চাকরি খোঁজার দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, পরিবারের প্রত্যাশা, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতা অনেক সময় মানুষকে নিজের স্বপ্নের চেয়ে বাস্তবতাকে বড় করে দেখতে বাধ্য করে। স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা তখন পেশাগত পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে বিষয়টি যত সহজ মনে হয়, ভেতরের বাস্তবতা ততটাই কঠিন।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণের পেছনে একটি পরিবারের বহু বছরের ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা একদিন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। রাষ্ট্রও একটি শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বিপুল বিনিয়োগ করে। কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যদি শেষ পর্যন্ত এমন একটি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করেন, যেখানে তার বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজনই নেই, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, এই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল আমরা কি পাচ্ছি?
আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মসমালোচনার জায়গা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়েছি, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কি শিল্প বেড়েছে? গবেষণাগার বেড়েছে? প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
ফলে আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি আমরা। একদিকে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ উপযুক্ত কাজের জন্য অপেক্ষা করছে, অন্যদিকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলছে, তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ সমস্যা শুধু কর্মসংস্থানের নয়; সমস্যা শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বেরও।
এ সংকটের আরেকটি দিকও আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। অফিস-সহায়কের মতো একটি পদ মূলত তাদের জন্য, যারা আর্থিক কিংবা পারিবারিক কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাননি। তাদের কাছে এটি একটি সম্মানজনক জীবিকার পথ। কিন্তু একই পদে যখন প্রকৌশলী, এমবিএ কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা প্রতিযোগিতায় নামেন, তখন তুলনামূলক কম শিক্ষিত আবেদনকারীদের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসে। এতে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ সবাই বাঁচার জন্যই কাজ খুঁজছেন। কিন্তু এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি ভারসাম্যহীন শ্রমবাজার শেষ পর্যন্ত সমাজের সব স্তরকেই প্রভাবিত করে।
বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, রোবটিক্স এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার কর্মক্ষেত্রের চেহারা পাল্টে দিচ্ছে। অনেক প্রচলিত পেশা হারিয়ে যাবে, আবার নতুন নতুন পেশার জন্ম হবে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের পাঠ্যক্রম, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নের কাঠামো পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে ডিগ্রি থাকবে, কিন্তু সেই ডিগ্রির বাজারমূল্য ক্রমশ কমতে থাকবে।
জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে শেখায়, শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে শিল্প, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান করে না; শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে, গবেষণায় অংশ নেয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দেয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথটি খুব বেশি অচেনা থাকে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সময় শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত এবং সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, গবেষণায় বিনিয়োগ, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ, এসবকে আর আলাদা প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোকে একই উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভাবতে হবে।
একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সব তরুণ সরকারি চাকরি করবেন না, আবার করাও সম্ভব নয়। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে যেমন দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উদ্যোক্তার। তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার জন্য নয়, কর্মসংস্থান তৈরির জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। নতুন উদ্যোগের জন্য সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
পাবনার ঘটনাটি তাই আমার কাছে কোনো বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়। এটি এমন একটি আয়না, যেখানে আমরা একই সঙ্গে দুটি বাংলাদেশকে দেখি। একদিকে একটি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের উদ্বেগজনক চিত্র। প্রথমটি আমাদের আশা জাগায়, দ্বিতীয়টি আমাদের সতর্ক করে।
আমরা প্রায়ই উন্নয়নের কথা বলি। নতুন সড়ক, সেতু, অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষ যদি নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ না পান, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনই অপূর্ণ থেকে যায়। একজন প্রকৌশলী অফিস-সহায়কের কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করতেই পারেন, এতে কোনো অসম্মান নেই। কিন্তু প্রশ্নটি তার কাজের নয়, তার অপূর্ণ সম্ভাবনার। যে মানুষটি হয়তো একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারতেন, কোনো শিল্পকারখানার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারতেন কিংবা গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারতেন, তাকে যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে হয়, তাহলে সেই ক্ষতি শুধু তার ব্যক্তিগত নয়; পুরো রাষ্ট্রের।
হয়তো ভবিষ্যতে পাবনার মতো আরও অনেক নিয়োগ হবে। আবার হয়তো সেখানেও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘ সারি দেখা যাবে। কিন্তু আমি চাই, একদিন যেন এই দৃশ্য বদলে যায়। এমন এক সময় আসুক, যখন একজন প্রকৌশলী প্রকৌশলী হিসেবেই কাজ করার সুযোগ পাবেন, একজন গবেষক গবেষণাগারেই নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে নেবেন, একজন দক্ষ কারিগর তার প্রাপ্য সম্মান পাবেন এবং সীমিত শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণও নিজের উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন না।
সেদিন হয়তো আমরা শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করব না; গর্ব করব এই ভেবে যে আমাদের শিক্ষা মানুষের সম্ভাবনাকে অপচয় করেনি। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন সেখানে যেখানে মানুষের স্বপ্ন আর তার কর্মজীবনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হয় না।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, নাগরিক চোখ, কবি ও প্রাবন্ধিক













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২