
একজন
শিক্ষার্থী সারা বছর পড়াশোনা করে, পরীক্ষার হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে উত্তর
লেখে, ফল প্রকাশের দিন বুকভরা আশা নিয়ে ফলাফল দেখে। তারপর যখন মনে হয়
প্রাপ্য নম্বরটি সে পায়নি, তখন শেষ আশ্রয় হিসেবে খাতা চ্যালেঞ্জ করে। এ বছর
সেই চ্যালেঞ্জের সংখ্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু একটি পরীক্ষার ফল
নিয়ে অসন্তোষের গল্প নয়; এটি আমাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থার
বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান
পরীক্ষায় খাতা পুনর্নিরীক্ষণ বা চ্যালেঞ্জের জন্য ১৩ লাখের বেশি আবেদন জমা
পড়েছে। ১৭ আগস্ট রাতে আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার আগে এ সংখ্যা ১৩ লাখ ছাড়িয়ে
যায় বলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের
চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। ‘ইত্তেফাক’-এর প্রতিবেদনে শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন,
মনে হচ্ছে সবাই খাতা পুনর্মূল্যায়ন করাতে চায়-এমনকি জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন এ+
পাওয়া শিক্ষার্থীরাও।
এ সংখ্যা আমাদের থামিয়ে ভাবায়। ১৩ লাখ শিক্ষার্থী
যদি নিজেদের খাতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে, তাহলে কি ১৩ লাখ খাতাতেই ভুল
হয়েছে? নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর মনে যদি এমন ধারণা
জন্মায় যে পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি, তাহলে সেই অনাস্থাকেও
হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু ফলাফলের নির্ভুলতাই
গুরুত্বপূর্ণ নয়; ফলাফলের প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের আস্থাও সমান
গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের প্রেক্ষাপটও
অস্বাভাবিক। ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলে ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে
এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ
এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার
পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী; উত্তীর্ণ হয়েছে
১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।
জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন, যা গত বছরের তুলনায়ও কম।
ফলে ফল
খারাপ হওয়ার পর খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন বেড়েছে-এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ১৩
লাখের বেশি খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদনকে কেবল ‘ফল খারাপ হওয়ার
প্রতিক্রিয়া’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ এবার সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি এসেছে পুনর্নিরীক্ষণের পদ্ধতিতে।
এতদিন ‘খাতা
চ্যালেঞ্জ’ কথাটি শুনে অনেক শিক্ষার্থী মনে করত, তাদের খাতা আবার একজন
শিক্ষক পড়ে নম্বর দেবেন। বাস্তবে তা ছিল না। শিক্ষা বোর্ডের প্রচলিত নিয়মে
পুনর্নিরীক্ষণের সময় মূলত দেখা হতো সব প্রশ্নের নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না,
নম্বর যোগ ঠিক আছে কি না, খাতার নম্বর ওএমআর বা ট্যাবুলেশন অংশে সঠিকভাবে
তোলা হয়েছে কি না এবং সে অনুযায়ী ওএমআর শিটে সঠিক বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে কি
না। অর্থাৎ এটি মূলত হিসাব ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল,
নতুন করে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা নয়। শিক্ষা বোর্ডের সরকারি বিধিতেও
পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় যাচাইয়ের কথা বলা আছে।
কিন্তু এবার
সরকার জানিয়েছে, আবেদন করা উত্তরপত্র নতুন করে যাচাই বা মূল্যায়নের সুযোগ
থাকবে এবং তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগে রিভিউয়ের ক্ষেত্রে মূলত ট্যাবুলেশন শিট দেখা
হতো; শিক্ষার্থীর খাতা পুনরায় দেখে শিক্ষক যথাযথ নম্বর দিয়েছেন কি না, তা
যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। এবার সেই সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই পরিবর্তন
নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এর সঙ্গে বড় একটি প্রশ্নও এসে দাঁড়িয়েছে-যদি
এবার তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে আগের
মূল্যায়নব্যবস্থায় এমন ব্যবস্থা ছিল না কেন?
এখানেই মূল সমস্যাটি। একটি
পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন কোনো সাধারণ কাজ নয়। একটি নম্বর কখনো
কখনো একটি শিক্ষার্থীর কলেজে ভর্তি, বৃত্তি, পছন্দের বিষয় নির্বাচন কিংবা
ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের পথ বদলে দিতে পারে। একটি নম্বরের জন্য কোথাও সুযোগ
খুলে যায়, আবার একটি নম্বরের জন্য কোথাও দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তাই পরীক্ষকের
হাতে দেওয়া প্রতিটি নম্বরের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের একটি অংশ
জড়িয়ে থাকে।
সরকারি পরীক্ষাবিধিতেই পরীক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট
মূল্যায়নমান অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। প্রধান পরীক্ষককে পরীক্ষকদের সঙ্গে
নির্দেশনা ও মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে হয় এবং নমুনা উত্তরপত্র
দেখে মূল্যায়নের মান যাচাই করার বিধানও রয়েছে। এমনকি পরীক্ষকের ভুল বা
নম্বরের অসংগতির বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম আছে।
কাগজে-কলমে নিয়ম
আছে—এটি ভালো খবর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবে নিয়মগুলো কতটা কার্যকরভাবে
প্রয়োগ হচ্ছে? এ বছরের পরীক্ষার আগেই শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, উত্তরপত্র
মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং
শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল,
অতীতে শিক্ষকরা বিপুলসংখ্যক খাতা অল্প সময়ে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হতেন।
এই
তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন পরীক্ষক যদি অস্বাভাবিক সংখ্যক
উত্তরপত্র অল্প সময়ে মূল্যায়ন করেন, তাহলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও
মূল্যায়নে অসামঞ্জস্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে সৃজনশীল বা বর্ণনামূলক
প্রশ্নে একই উত্তরের মূল্যায়নে পরীক্ষকভেদে নম্বরের পার্থক্য তৈরি হওয়ার
সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশের উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে গবেষণায়ও পরীক্ষকভেদে
নম্বরের সামঞ্জস্য বা ‘ইন্টার-রেটার রিলায়েবিলিটি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আরও
উদ্বেগজনক হলো, চলতি বছর উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও সামনে
এসেছে। মে মাসে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড একজন শিক্ষককে এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয়
পত্রের খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার কথাও বোর্ড জানিয়েছিল।
একটি
বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো শিক্ষকসমাজ বিচার করা অন্যায়। দেশের বিপুলসংখ্যক
শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অনিয়মও
একটি পাবলিক পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি। কারণ পরীক্ষা এমন
একটি জায়গা, যেখানে ‘বেশির ভাগই ঠিক’ যথেষ্ট নয়; প্রতিটি পরীক্ষার্থীর
প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাহলে করণীয় কী?
প্রথমেই
দরকার পরীক্ষক নির্বাচনের একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ডেটাবেস। কোন শিক্ষক
কোন বিষয়ে কত বছর ধরে পড়াচ্ছেন, তাঁর প্রশিক্ষণ কী, আগের মূল্যায়নে তাঁর
ভুলের হার কেমন-এসব তথ্য সংরক্ষণ করে পরীক্ষক নিয়োগ করা যেতে পারে। নিয়মিত
প্রশিক্ষণ ও মান নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু শিক্ষক হলেই পরীক্ষক
হওয়া যাবে-এই ধারণা বদলাতে হবে।
মূল্যায়নের সময়সীমাও বাস্তবসম্মত হতে
হবে। একটি খাতা কত সময়ে মানসম্মতভাবে দেখা সম্ভব, সে বিষয়ে বিষয়ভেদে
বৈজ্ঞানিক হিসাব থাকা দরকার। পরীক্ষকের ওপর অতিরিক্ত খাতা চাপিয়ে দিয়ে
দ্রুত মূল্যায়নের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরও
গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্যায়নের মানদণ্ড বা ‘মার্কিং রুব্রিক’ আরও স্পষ্ট
করা। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্ম, ব্যবসায় শিক্ষা
কিংবা অন্যান্য বর্ণনামূলক বিষয়ে কোন উত্তরে কত নম্বর পাওয়ার যৌক্তিকতা
রয়েছে, তার নির্দিষ্ট নির্দেশনা পরীক্ষকদের দিতে হবে। নমুনা উত্তরপত্র দিয়ে
পরীক্ষকদের ক্যালিব্রেশন করানো যেতে পারে।
প্রযুক্তিও এখানে বড় ভূমিকা
রাখতে পারে। উত্তরপত্রের ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা সম্ভব হলে সন্দেহজনক
মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন করা যাবে। ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট
সীমার বেশি নম্বরের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরপত্র দ্বিতীয়
পরীক্ষকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্য প্রযুক্তি কখনো
মানুষের বিচারবোধের বিকল্প নয়; বরং প্রযুক্তিকে মানুষের ভুল কমানোর হাতিয়ার
হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো শিক্ষার্থীর জন্য একটি
ন্যায়সংগত আপিলব্যবস্থা তৈরি করা। খাতা চ্যালেঞ্জ যেন কেবল ফল বদলের আশায়
টাকা দিয়ে আবেদন করার প্রক্রিয়া না হয়; এটি যেন সত্যিকারের একাডেমিক
ন্যায়বিচারের পথ হয়। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বা তৃতীয়
পরীক্ষকের মূল্যায়ন, নম্বরের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলে মডারেশন এবং
প্রমাণিত ভুলের ক্ষেত্রে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
১৩ লাখ
আবেদন আমাদের সামনে আসলে একটি আয়না ধরেছে। সেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের হতাশা
নেই; আছে আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্ন। এত বিপুলসংখ্যক
শিক্ষার্থী যদি মনে করে তাদের প্রাপ্য নম্বর নিয়ে সন্দেহ আছে, তাহলে দায়
শুধু শিক্ষার্থীর নয়-ব্যবস্থাকেও নিজের দিকে তাকাতে হবে।
পরীক্ষা কোনো
যান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন তরুণের মেধা,
পরিশ্রম ও ভবিষ্যৎকে মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতিতে সামান্য
ভুলও কারও জীবনে বড় অন্যায় হয়ে উঠতে পারে। তাই ‘খাতা ঠিকভাবে দেখা হয়েছে কি
না’-এ প্রশ্নকে পরীক্ষার্থীর আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আমাদের
লক্ষ্য এমন একটি মূল্যায়নব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ফল প্রকাশের পর লাখ লাখ
শিক্ষার্থীকে খাতা চ্যালেঞ্জ করতে হবে না; আর যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করে, সে
জানবে-তার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে শোনা হবে। একটি ভালো পরীক্ষা ব্যবস্থার
সাফল্য শুধু কত দ্রুত ফল প্রকাশ করা গেল, তা দিয়ে মাপা যায় না; মাপতে হয়
কতটা ন্যায্যভাবে একজন শিক্ষার্থীর প্রাপ্য নম্বর নির্ধারণ করা গেল, তা
দিয়ে।
কারণ একটি ভুল নম্বর কেবল একটি সংখ্যার ভুল নয়। কখনো কখনো সেটি
একটি স্বপ্নের ভুল ঠিকানা। আর রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড়
দায়িত্ব হলো-কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন একটি অবহেলিত খাতা, ক্লান্ত
পরীক্ষক কিংবা অসম্পূর্ণ মূল্যায়নের কাছে পরাজিত না হয়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
