
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর সড়কে নারীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে চালু হল
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষ সেবা-গোলাপী বাস। এই
সেবার উদ্বোধন করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, অতীতের অনেক
উদ্যোগের মত এই গোলাপী বাস যেন হারিয়ে না যায়।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও বিআরটিসির ট্রাক ডিপোতে গোলাপী বাসের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী।
তিনি
বলেন, “এই সেবার মান সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত করতে হবে এবং নারী যাত্রীরা
যাতে নিরাপদ ও স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
অতীতে
বিভিন্ন উদ্যোগ উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উদাহরণ তুলে
ধরে মন্ত্রী বলেন, “এমনও হয়েছে, কোনো সেবা উদ্বোধনের ছয় মাস পর সেটির আর
অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সরকার এমনটি হতে দেবে না।”
বিআরটিসি ও
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আজ যে সেবা শুরু হচ্ছে, দুই
মাস পর এই সেবার মান আরও বাড়াতে হবে। বিদ্যমান লজিস্টিক সহায়তা ও জনবল হয়তো
নতুন ব্যবস্থার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। তবে প্রতিদিন
ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হবে।”
নারী যাত্রীরা যাতে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাসে যাতায়াতে উৎসাহিত হন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন শেখ রবিউল আলম।
তিনি
বলেন, “এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সরকার করবে এবং মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে
দায়বদ্ধ থাকবে। এই উদ্যোগকে টেকসই রাখা, আরও সমৃদ্ধ করা এবং প্রসারিত করাই
মূল চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় প্রস্তুত রয়েছে।
সাংবাদিকদের উদ্যোগটির ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে তা সংশোধনে সহযোগিতা করবেন।”
নারীদের
যাতায়াতের পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “নারী
যাত্রীদের জন্য বাসে ওঠার আগের অপেক্ষার সময় থেকে শুরু করে বাসে ওঠা এবং
বাস থেকে নামা পর্যন্ত পুরো যাত্রাটিই নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে।
অপেক্ষার সময় অনেক নারী বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
“বাসের ভেতরেও ব্যবস্থাপনার কারণে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার বাস থেকে নামার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়।”
তিনি
বলেন, “দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। রাষ্ট্র বিনির্মাণে নারীর
অবদান রয়েছে। ভোটারদেরও অর্ধেকের বেশি নারী। পরিবারের অর্থনীতিতেও নারীর
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই নারীদের সক্ষমতাকে রাষ্ট্রের কাজে পুরোপুরি
ব্যবহার করতে হলে তাঁদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
১৪ বাসে শুরু, বাড়বে রুট:
নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি
নারী চালকের মাধ্যমে বাস পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি
বলেন, নারীবান্ধব ও নারী চালক দ্বারা পরিচালিত পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা
সরকারের ‘অঙ্গীকারের অংশ’।
এর অংশ হিসেবে ১৪টি বিশেষ বাস চালু করা
হচ্ছে। ঢাকার ১০টি রুটে ১০টি বাস, চট্টগ্রামে দুটি রুটে দুটি এবং বগুড়ায়
দুটি রুটে দুটি বাস চলবে। ঢাকার ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি
দ্বিতল।
আগামী দিনে এই সেবা আরও সম্প্রসারণ করা হবে জানিয়ে শেখ রবিউল
আলম বলেন, “রুটের সংখ্যা ও বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে। বর্তমানে যে পরিবেশে
নারীরা যাতায়াত করছেন, সেটিও ধীরে ধীরে আরও উন্নত করা হবে।”
বিআরটিসিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা:
বিআরটিসির
বর্তমান ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন,
“বিআরটিসি বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বা তার বেশি বাস পরিচালনা করছে।
বর্তমানে সংস্থাটি লোকসানে নেই, ব্রেক-ইভেন অবস্থায় রয়েছে।”
তবে
মানসম্মত সেবা ও পরিচালনায় সমস্যা রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, “বিদ্যমান
জরাজীর্ণ ব্যবস্থাপনাকে সময়ের সঙ্গে ঢেলে সাজিয়ে যুগোপযোগী ও যাত্রীবান্ধব
করতে হবে।”
ঢাকার বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন শেখ রবিউল আলম।
তিনি
বলেন, “অনেক রুটের অস্তিত্ব নেই, কিন্তু সেসব রুটের পারমিট রয়েছে। আবার
অনেক রুটে পারমিট নেই, তারপরও বাস চলছে। অনেক আগে এসব রুট করা হয়েছিল। এখন
যাত্রীদের চাপ ও প্রয়োজন বিবেচনা করে রুট ও রুট পারমিট নতুন করে নির্ধারণ
এবং ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
২০০ ই-বাসের ১০০টি নারীদের জন্য:
পরিবেশবান্ধব
গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ২০০ ইলেকট্রিক বাস
কেনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। তিনি বলেন,
প্রকল্পের মাধ্যমে ই-বাস কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, দরপত্র ও আন্তর্জাতিক
ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করতে কমপক্ষে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। এ কারণে সরাসরি
ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার
ক্ষেত্রে ই-বাস অত্যন্ত জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে
পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাও সরকারের অঙ্গীকারের অংশ।”
এই ২০০
ই-বাসের মধ্যে ১০০টি নারীদের জন্য বিভিন্ন রুটে রাখার কথা জানিয়ে তিনি
বলেন, “এর ফলে নারী বাসসেবার রুট ও বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে। শুধু বর্তমানে
যেসব এলাকায় এই সেবা চালু হচ্ছে তা নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য বিভাগেও এই সেবা
সম্প্রসারণ করা হবে।”
নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সড়ক
পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ,
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব, বিআরটিসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।