
নোয়াখালীগামী
উপকূল এক্সপ্রেস। কুমিল্লার রাজাপুর স্টেশন অতিক্রম করতেই হঠাৎ বিকট শব্দে
জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে ছুটে আসে একটি পাথর। মুহূর্তেই পাথরের আঘাতে মাথায়
জখম হয়ে ট্রেনের ভেতর লুটিয়ে পড়েন পঞ্চাশোর্ধ্ব যাত্রী মহিউদ্দিন। বগিতে
ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। রেলকর্মীরা দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যবস্থা নেন। পরে
নোয়াখালী পৌঁছে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।
৩০ জুলাই রাতে উপকূলে
পাথর ছোড়ার ঝটনাটি কোন বিচ্ছন্ন ঘটনা নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও
লাকসাম-চাঁদপুরসহ কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলন্ত ট্রেন
লক্ষ্য করে একের পর এক পাথর ছুড়ছে দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তেই ভেঙে যাচ্ছে
ট্রেনের জানালার কাচ। হঠাৎ ছুটে আসা পাথরের আঘাতে আহত হচ্ছেন নানা বয়সী
যাত্রী। কারও মাথা, কারও চোখ, নাক কিংবা কানে লাগছে গুরুতর আঘাত। ঘটেছে
প্রাণহানির ঘটনাও। ফলে দেশের একমাত্র নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে
পরিচিত ট্রেনে যাতায়াতেও এখন বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
রেলওয়ে চট্টগ্রাম
অঞ্চলের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এই পাঁচ
মাসে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলন্ত ট্রেনে ৬২টি পাথর
নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম
রুটেই ঘটেছে ৩৭টি ঘটনা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ১৯টি, লাকসাম-নোয়াখালী
রুটে ৪টি এবং লাকসাম-চাঁদপুর রুটে ঘটেছে ২টি ঘটনা। প্রতিটি ঘটনায় ভেঙেছে
ট্রেনের জানালার কাচ। পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন জানালার পাশে বসা ব্যক্তি ও
আশপাশের যাত্রীরা। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি
সংশ্লিষ্টদের।
পাথর নিক্ষেপের এমন ঘটনায় আতঙ্কিত যাত্রীরা বলছেন,
নিরাপদে যাতায়াতের জন্য ট্রেনে উঠলেও কখন কোথা থেকে পাথর এসে আঘাত করবে,
সেই ভয় এখন তাড়া করে। সড়ক পথে যাতায়াতে ভোগান্তি এড়াতে প্রথম পছন্দ
ট্রেনকেই বেছে নিচ্ছেন তারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায়
নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহনে যাতায়াতে আতঙ্ক ও ভীতি কাজ করছে।
৩০ জুলাই
রাতে আহত উপকূল এক্সপ্রেসের যাত্রী মহিউদ্দিন বলেন, আখাউড়া স্টেশন থেকে
তিনি নোয়াখালী মাইজদীর উদ্দেশ্যে উপকূলে উঠেন। তার বসার আসন ছিল জানালার
পাশে। কুমিল্লার রাজাপুর স্টেশন অতিক্রম করতেই ট্রেনের ভেতরে বসে হঠাৎ
মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাই। প্রথমে বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। পরে দেখি মাথা
দিয়ে রক্ত পড়ছে। তখন বুঝতে পারি বাইরে থেকে পাথর এসে লেগেছে। জীবনে এমন
ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের যাত্রা করা
মহানগর প্রভাতীর যাত্রী ফাহিমা বেগম বলেন, ট্রেনে আমরা নিরাপদে যাতায়াতের
জন্য উঠি। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ পাথর এসে জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে
পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। একটা পাথর চোখে বা মাথায় লাগলে বড় ধরনের
দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে ট্রেনে চলাচল করি। বাইরে থেকে
কে পাথর ছুড়ছে, সেটা বোঝারও সুযোগ থাকে না। প্রশাসনের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ
এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। একটা পাথর শুধু কাচ ভাঙে না,
একজন মানুষের জীবনও শেষ করে দিতে পারে। যারা এসব করছে তাদের দ্রুত শনাক্ত
করে আইনের আওতায় আনা দরকার।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর
নিক্ষেপের এসব ঘটনার সঙ্গে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর, মাদকসেবী ও
ছিনতাইকারীদের একটি অংশ জড়িত। তবে একের পর এক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত এসব
ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি রেল নিরাপত্তা বাহিনী। তবে যাত্রীদের
প্রশ্ন, এতগুলো ঘটনা ঘটার পরও অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না কেন?
রেললাইনের পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি
বাড়ানো হচ্ছে না কেন?
সুবর্ণ এক্সপ্রেসে পাথরের আঘাতে আহত যাত্রী
মুসায়েব হোসেন বলেন, হঠাৎ জানালার কাচ ভেঙে পাথর ভেতরে ঢুকে পড়ে। কয়েক
মুহূর্তের জন্য সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ একটি পাথর মাথায় আঘাত করে।
সাথে সাথে তিনি বসা থেকে ট্রেনের ভেতরেই লুটিয়ে পড়ি। পরে স্বাভাবিক হয়ে
জানাতে পারেন বাহির থেকে পাথর নিক্ষেপের ফলে জানালার কাচ ভেঙ্গে তার মাথায়
আঘাত করে। ট্রেনে বসে এভাবে আহত হতে হবে, এটা কখনো ভাবিনি।
তিনি বলেন,
আমরা মনে করি ট্রেন নিরাপদ একটি পরিবহন। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে
পাথর এসে মানুষ আহত হলে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। যারা এসব
করছে তাদের দ্রুত খুঁজে বের করা উচিত।
এদিকে পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা
অন্যান্য সময়ের তুলনায় বাড়ছে দাবি করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী লাকসাম
আরএনবির ওসি নুর মোহাম্মদ বলেন,টহল বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে
নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত টহল
দিচ্ছি। পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম
পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত, আটক কিংবা
তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে রেলওয়ে পুলিশ জিআরপির কাছ থেকে
স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও
বিষয়টি নিয়ে এড়িয়ে যান রেলওয়ে পুলিশ চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার তহুরা
জান্নাত।
এদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন,
পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে।
রেললাইনের পাশের বসতিগুলোতে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপের ভয়াবহতা
তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন এনজিওর
সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে
কিছুটা কমিয়ে আসলেও সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা অঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাটি
বেড়েছে। তবে আমরা চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের প্রতিরোধে জনসচেতনতার
পাশাপাশি তদন্ত করছি এটি নিছক দুষ্টুমি, নাকি এর পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত
নাশকতা রয়েছে।
