
কুমিল্লার
চান্দিনা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ মাধাইয়া-নবাবপুর সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু
হওয়ার নয় মাস পেরিয়ে গেলেও কাজের ধীরগতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়
বাসিন্দারা। টানা বৃষ্টিতে সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও কাদার স্তর।
কোথাও কোথাও জমে আছে পানি। ফলে যানবাহন চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, বাড়ছে যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি এবং
জনদুর্ভোগ।
দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাধাইয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে
বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় মহাসড়কে যান চলাচল
ব্যাহত হয় এবং সৃষ্টি হয় যানজটের।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে
সড়কটির উন্নয়নকাজ চললেও বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। দ্রুত কাজ
শেষ করার পাশাপাশি সংস্কারকাজের সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
বিক্ষোভকারীদের
একজন আবুল কাশেম অভি বলেন, “অনেক আগে কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত রসুলপুর
বাজারের সামান্য অংশে শুধু আরসিসি ঢালাই হয়েছে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে
যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিনই মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। দ্রুত কাজ
শেষ করার দাবিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে লোকবল
বাড়িয়ে কাজ শেষ না করলে আরও বড় কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
নয় মাসে অগ্রগতি সামান্য;
স্থানীয়
সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা
ব্যয়ে মাধাইয়া থেকে রাণীচড়া ব্রিকস ফিল্ড পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার
সড়কের উন্নয়নকাজ গত বছরের ২৩ নভেম্বর শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় রসুলপুর
বাজার ও মহিচাইল বাজার অংশে আরসিসি ঢালাই সড়ক নির্মাণের কথা রয়েছে।
তবে
কাজ শুরুর প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও রসুলপুর বাজারের একটি অংশে আরসিসি
ঢালাইয়ের কাজ হয়েছে। মহিচাইল বাজার অংশে এখনো কাজ শুরু হয়নি। পুরো সড়কের
পুরোনো কার্পেটিং তুলে ফেলা হলেও সংস্কারকাজ চলছে ধীরগতিতে। নিশ্চিন্তপুর
থেকে ইটের কংক্রিট ফেলার কাজ এগিয়ে মহিচাইল হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এদিকে
রসুলপুর বাজারে আরসিসি ঢালাইয়ের গাইড ওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের কাজের
অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। নির্মিত গাইড ওয়ালের কিছু অংশের ইট স্থানীয়রা
খুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সড়কের
পাশ থেকেই মাটি কেটে এনে সড়কে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সড়কের ভিত্তি দুর্বল
হয়ে ভবিষ্যতে ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৃষ্টি-কাদায় চরম দুর্ভোগ;
সরেজমিনে
দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে মাধাইয়া-নবাবপুর সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত
তৈরি হয়েছে। গর্তে জমে আছে পানি ও কাদা। কোথাও সড়ক আর কোথায় গর্ত—তা বোঝারও
উপায় নেই। এর মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে যাত্রীবাহী সিএনজি, অটোরিকশা,
ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন।
বিশেষ করে বালুবোঝাই ড্রাম ট্রাক চলাচলের
কারণে সড়কের ক্ষতি আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি,
সংস্কারাধীন ও নাজুক সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করা হলে নতুন
করে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একের পর এক দুর্ঘটনা;
বেহাল
সড়কে ইতোমধ্যে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ বছরের ২৩ জুন ভাঙা সড়ক দিয়ে
মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময় মহিচাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাইড ওয়াল ভেঙে একটি ট্রাক
পড়ে যায়। গত সপ্তাহে কাশিমপুর মাজারসংলগ্ন এলাকায় একটি মালবাহী ট্রাক
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যায়।
এর আগে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় মাছের
ফিডবোঝাই একটি ট্রাক খাদে পড়ে যায়। এছাড়া ছেঙ্গাছিয়া ব্রিজ এলাকায় ৫৫০
বস্তা সিমেন্টবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয়দের
অভিযোগ, সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও কাদার কারণে চালকদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি
নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার পাশাপাশি যানবাহনের যন্ত্রাংশও
দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
‘গর্তে পড়ে বুক-পিঠের হাড় ভেঙেছে’
সিএনজিচালক
জাকির, শাহজাহান ও দুলাল বলেন, “সড়কের বর্তমান অবস্থায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত
ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে অনেক সিএনজিচালক যাত্রী নিয়ে গর্তে পড়ে আহত হয়েছেন।
প্রতিদিনই গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভেঙে যাচ্ছে। মেরামতে অতিরিক্ত টাকা খরচ
হচ্ছে। দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা জরুরি।”
জামিরাপাড়া
গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, “বাড়ি থেকে মাধাইয়া যাওয়ার পথে নিশ্চিন্তপুর
এলাকায় সিএনজির এক্সেল ভেঙে আমি খাদে পড়ে যাই। এ সময় যাত্রীসহ সিএনজিটি
আমার ওপর পড়ে যায়। এতে বুক ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়। বেহাল সড়কের কারণেই আমি
দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি।”
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আব্দুস সালাম বলেন,
“সড়কের বর্তমান অবস্থায় গাড়ি চলাচল করা কঠিন। কিছুদিন আগে মাছের ফিডবোঝাই
একটি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে যায়। এখন এই সড়ক দিয়ে হাঁটাচলাও মুশকিল হয়ে
পড়েছে।”
মসজিদে যেতেও দুর্ভোগ;
জামিরাপাড়া বাইতুল হুদা জামে মসজিদের
মুসল্লি সুরুজ মিয়া বলেন, “বাড়ি থেকে বের হয়ে মসজিদে যাওয়াই এখন কঠিন হয়ে
পড়েছে। সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত ও কাদা। হাঁটতে গেলে কাপড়চোপড় নষ্ট হয়ে যায়।
বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়।”
সংস্কারকাজের সাইট ম্যানেজার মো.
আনোয়ার বলেন, “বৃষ্টির কারণে সড়কের উন্নয়নকাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে
প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি। কাজ দ্রুত শেষ করতে ইতোমধ্যে
লোকবল বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের আগেই উন্নয়নকাজ শেষ করা
সম্ভব হবে।”
চান্দিনা উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) গোলাম উল্লাহ বলেন,
“আমি সম্প্রতি চান্দিনায় যোগ দিয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠিকাদার
প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের
অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের উন্নয়নকাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ায় দুর্ভোগ দিন
দিন বেড়েই চলেছে। বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একদিকে
সড়কের বড় বড় গর্ত, অন্যদিকে কাদা ও পানি—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী, রোগী,
পথচারী, যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তাদের
দাবি, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত
করতে হবে। একই সঙ্গে সংস্কারাধীন নাজুক সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ
এবং প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কার্যকর উদ্যোগ
নিতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা
করছেন স্থানীয়রা।
