
বর্তমানে
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনীতির
কিছু সূচক সন্তোষজনক পরিস্থিতিতে নেই। প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই
চলেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছেন। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে
আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। অন্যদিকে দেশে ক্রমাগত বৈষম্য বাড়ছে। এর মধ্যে
অন্যতম হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী
বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের সাধারণ জনগণ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। তার কারণ
হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উচ্চমধ্যবিত্তের মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে
পারে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো সঞ্চয় নেই। প্রতিনিয়ত এই মানুষগুলোর
জীবনমান ক্রমশই নিম্নমুখী হচ্ছে। কাজেই এখানে যা কিছু করতে হবে, বিশেষ করে
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব প্রকল্প আছে তা যেন
সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচিতে যেসব বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার সুবিধা প্রকৃত লোকজন পায় না। এখানেও
দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক
অবস্থায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো
প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায়
বরাদ্দ অনেক কম। এরপর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেটাও সঠিকভাবে ব্যয় হয় না। ফলে
সরকারি অর্থ ব্যবহারের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব আছে, ওই
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ফলে বরাদ্দ অর্থের
সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকের ঋণের ওপর
নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। কারণ, সরকারি বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। এতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম
ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রতিটি দেশই চায় কীভাবে সর্বাধিক জনকল্যাণ নিশ্চিত
করা যায়। বিপরীতে বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর দরকার আছে। সে
ক্ষেত্রে ঋণ না নিয়ে কীভাবে রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় মেটানো যায়,
সেটা সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর
পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে দেশে এখনো পর্যাপ্তভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে না।
যদিও বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত উপযোগী একটি স্থান।
এখানে রয়েছে ১৭ কোটি ভোক্তার এক বিশাল বাজার। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের প্রতিবন্ধতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।
অধিকাংশ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে
দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ
প্রস্তাব অনুমোদন এবং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হতে হয়।
ফলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করতে হয়। একটি প্রকল্প
নির্দিষ্ট সময়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে পারে না বলে অভ্যন্তরীণ এবং
আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পণ্য অনেক সময়ই উপযোগিতা হারায়। ব্যক্তি খাতে
বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়ন অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব
হবে না। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাটা বর্তমান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ
চ্যালেঞ্জ। যদিও এই চ্যালেঞ্জ তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। আগে থেকেই
অর্থনীতিতে বিদ্যমান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় খাতে যে বিনিয়োগ হয়, তা মূলত
অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে। আর ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎপাদন বৃদ্ধি করে।
তাই ব্যক্তি খাতের ওপর বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য জোর দিতে হবে। কিন্তু
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, অনেক দিন ধরেই দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ
কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্তিমিত হয়ে আছে। উদ্যোক্তা এবং
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজমান ছিল। আমাদের বেসরকারি
খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু করণীয় আছে। প্রথমত, দেশে আইনশৃঙ্খলা
পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত খুব একটা সন্তোষজনক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই
ভালো করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার
ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নানা রকমের সমস্যা আছে। তৃতীয়ত, ইজ-অব-ডুয়িং-বিজনেস যে
সূচকে আছে, সেই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। এর মধ্যেবেশ কিছু
সাব-ইন্ডিকেটরস আছে। সেগুলোর উন্নতি হওয়া দরকার। এ বিষয়গুলো যদি আমরা
সমন্বয় করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় যে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। আর
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।
দেশে
করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে, কিন্তু কর দেন না এ সংখ্যাটা বিশাল।
তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও আদায়ের
ঘাটতি আছে। অনেক পণ্য কিনলে ভ্যাটের রসিদ দেওয়া হয় না। এই রসিদ দেওয়া
নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের দোকানপাটেও ভালো
বেচাকেনা হয়। তারা ভ্যাটের আওতায় আসার যোগ্য। তাই তাদের ভ্যাটের আওতায় আনতে
হবে। এভাবেই করের পরিধি বাড়াতে হবে। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অবশ্যই পদক্ষেপ
নেওয়া উচিত। এজন্য বর্তমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত
করা জরুরি। তাদের কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে কর ফাঁকি
রয়েছে। যেমন ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক দোকানদার রসিদ দেন না। তারা টাকা
আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে জমা দেন না। আয়করের ক্ষেত্রে যাদের টিআইএন
যাদের আছে, আয়কর রিটার্ন জমা দেয় তার অর্ধেক। বাকি অর্ধেককে কেন পাওয়া
যাচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। সে ক্ষেত্রে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
দেশের
ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব আছে। বিগত সময়ে খেলাপি ঋণ বেপরোয়াভাবে বেড়ে
যাওয়াসহ অর্থ পাচারের অপসংস্কৃতি বেড়ে গিয়েছিল। এর কারণ, ঋণ দেওয়ার
ক্ষেত্রে পারস্পরিক আঁতাত ছিল। পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে এক ব্যাংকের
মালিকপক্ষ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। তারাও আবার নিজেদের ব্যাংক থেকে ওই
মালিকদের ঋণ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই ঋণ পরিশোধ করেনি। রাজনৈতিক
নেতা, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ঋণ গ্রহীতার পারস্পরিক যোগসাজশে এসব
ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে
সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি
সন্তোষজনক নয়। ফলে রপ্তানি আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখীকরণ
জরুরি। কারণ, এখনো আমাদের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
ফলে এখানে নতুন নতুন পণ্য কীভাবে যোগ করা যায়, সেজন্য চেষ্টা করতে হবে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি খাত হলো রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) হলেও
রেমিট্যান্সের অবস্থা ভালো নয়। যদিও জনশক্তি রপ্তানি অনেক বাড়ছে, কিন্তু
রেমিট্যান্স বাড়ছে না। বর্তমানে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রণোদনা দেওয়া হয়।
এটিও তেমন কাজ করছে না। কাজেই রেমিট্যান্স বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ
ক্ষেত্রে কীভাবে সহজে রেমিট্যান্স পাঠানো যায়, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে
হবে। কাজেই সুফল পেতে জনশক্তি রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে
মনোযোগ দিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
