কুমিল্লার
দেবিদ্বার উপজেলার একটি কওমি মাদরাসায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নির্মম ও
অমানবিকভাবে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর
ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের ওপর
নিষ্ঠুর মাদরাসার এক শিক্ষকের নির্যাতনের দৃশ্য দেখা গেছে। ঘটনাটি কয়েক বছর
আগের দাবি করা হলেও শনিবার প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাঁর
ভেরিফাইড ফেসবুকে নির্যাতনের ৬ মিনিটের ওই ভিডিওটি পোস্ট দেয়ার পর বিষয়টি
নতুন করে ভাইরাল হয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, ওই মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ
জাকারিয়া কয়েকজন ছাত্রকে চড়-লাথি মেরে ফেলে দিচ্ছেন, পরবর্তীতে একটি লাঠি
দিয়ে শিশুদের এলোপাতারি নির্মমভাবে পেঠাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,
নির্যাতনের ওই ভিডিওটির ঘটনাটি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বারেরা
ফুলগাছতলা মির্জা আবদুল করিম ম্যানসনের তিনতলায় অবস্থিত বাবুস সালাম
মাদরাসার।
তবে রবিবার (২৬ জুলাই) বিকালে বাবুস সালাম মাদরাসায় গিয়ে
দেখা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক হাফেজ জাকারিয়াকে মাদরাসা থেকে চাকুরিচুত্য করা
হয়েছে। তিনি মুরাদনগর উপজেলার পরিষদ সংলগ্ন ‘মারকাযুন নুর মাদরাসায় নামে
অপর একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন। ওই মাদরাসায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন
করে নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর তিনি ওই মাদরাসা থেকে পালিয়ে
আত্মগোপনে চলে গেছেন।
মাদরাসার একজন অভিভাবক মো.সেলিম বলেন, ঘটনার
ভিডিও দেখার পরপর আমরা মাদরাসায় এসেছিলাম, তখন ওই শিক্ষক আমাদের কাছে ক্ষমা
চায়। কিন্তু মাদরাসার কর্তৃপক্ষের অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো
আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে তাবলীগের চিল্লায় পাঠায়। আমরা সন্তানদের
মাদরাসায় পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকি। পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আমার মত অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে আছেন।
দেবিদ্বার বাবুস সালাম (ভারপ্রাপ্ত) মুহতামিম মাও. আবু সাঈদ মজুমদার
বলেন, শিশুদের নির্যাতনের ঘটনার ভিডিওটি এই মাদরাসার ঘটনা। তবে এটি
আনুমানিক দেড়-দুই বছর আগের ভিডিও। আমি তখন এই মাদারাসায় ছিলাম না, মাদরাসায়
এসে জানতে পেরেছি এই ঘটনা। এছাড়াও ওই সময়ের নির্যাতনের শিকার কোন ছাত্রই
এই মাদরাসায় এখন আর পড়ে না। ওই হুজুর যে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করেছে
তাদের মধ্যে মাহদী নামে এক শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের আপন ভাতিজা। এই ঘটনার পর
ওই শিক্ষক মাদরাসার পৃষ্ঠপোষক মাও. আনিসুর রহমানসহ অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা
চেয়েছেন। পরবর্তীতে তাকে তার ভুল সংশোধনের জন্য মাদরসার পক্ষ থেকে তাবলীগের
তিন চিল্লায় পাঠানো হয়। চিল্লা শেষে তিনি মাদরাসায় আসার পর ভিডিওটি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, নিজের
জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি মাদরাসার
চাকরি ছেড়ে চলে যান। তিনি আরও বলেন, আমি ভিডিওটি দেখেছি, এটি মাদরাসায়
শিক্ষার পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতি করেছে। সাধারণ মানুষ এই ভিডিও দেখে স্থীর
থাকতে পারবে না, অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।
বাবুস
সালাম মাদরাসার পৃষ্ঠপোষক মাও.আনিসুর রহমান বলেন, হাফেজ জাকিরায়াকে
সম্পর্কে আমার ভাগনী জামাই। এই ঘটনাটি অন্তত ৪ বচর আগের ঘটনা। তবে আমি
জানতে পেরেছি আড়াই বছর পর। জানার পর পর আমি অভিভাবদের সঙ্গে মিটিং করেছি।
অভিভাবকদের সঙ্গে হাফেজ জাকারিয়ার মীমাংসা হয়। এরপ আমি তাকে শারীরিকভাবে
শাসন করেছি, পরবর্তীতে আমি তাকে তিন চিল্লায় পাঠিয়েছি। ভিডিওটি কয়েক দফায়
ভাইরাল হয়েছে। পরে আমি তাকে মাদরাসা থেকে বিদায় করে দেই। সে মুরাদনগর গিয়ে
আরেকটি মাদরাসায় যোগদান করে, আজকে সন্ধ্যায় খবর পেলাম প্রশাসন নাকি ওই
মাদরাসাটি বন্ধ করে দিয়েছে। অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করায় তার
বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ
(ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমি ও দেবিদ্বার সার্কেল স্যার রবিবার সকালে
মাদরাসাটি পরিদর্শন করেছি। মাদরাসার বর্তমান শিক্ষকরা জানিয়েছেন,
নির্যাতনের ওই ভিডিওটি কয়েক বছর আগে ধারণ করা। আমরা ওই মাদরাসায় বর্তমান
যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের সর্তক করে এসেছি। এছাড়া নির্যাতনের শিকার কোন
শিক্ষার্থীর অভিভাবক থানায় এসে অভিযোগ দেয়নি। এখনও যদি কেউ অভিযোগ দেয় আমরা
অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
