
সংবিধানের
২৮ (১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রধর্ম, জাতি, বর্ণ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো
নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো বৈষম্য করা যাবে না বলে সুস্পষ্ট বিধান আছে। আমাদের
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা
প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশ
প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কখনো ধর্মের নামে, কখনো লৈঙ্গিক পরিচয়ে,
কখনো জাতিগত কারণেও তারা বৈষম্যের শিকার।
এই প্রেক্ষাপটে এক দশকের বেশি
সময় ধরে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বৈষম্যবিরোধী আইন করার দাবি
করে আসছিল। বিলম্বে হলেও সরকার সেই দাবি মেনে নিয়ে ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে
বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২ উত্থাপন করেছে। পরে বিলটি পর্যালোচনার জন্য সংসদীয়
কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। বিলটিতে বলা হয়েছে, এ আইনবলে একজন নাগরিক কোনো
সরকারি বা বেসরকারি অফিস, জনসমাগম হয় এমন কোনো স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
যেকোনো রকম বৈষম্যের শিকার হলে প্রতিকার চাইতে পারবেন। আইনে জেলা ও বিভাগীয়
পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে।
আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে
স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে বিলটি নিয়ে নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ
থেকে যেসব আপত্তি এসেছে, সে সম্পর্কেও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিলে বৈষম্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। অপরাধ
হিসেবে চিহ্নিত না হলে এর বিচার করা বা দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়াও
কঠিন হবে। ভারত ও নেপালে যে বৈষম্যবিরোধী আইন পাস হয়েছে, তাতে বৈষম্যকে
অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিকার পেতে হলে ভুক্তভোগীকে
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রথমে তিনি যাবেন জেলা মনিটরিং
কমিটিতে। ৩০ দিনের মধ্যে তারা সমাধান দিতে না পারলে বিভাগীয় কমিটিতে যাবেন।
তারাও ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিকার না দিলে ভুক্তভোগীকে জাতীয় মনিটরিং কমিটির
দ্বারস্থ হতে হবে। এখানেও ব্যর্থ হলে আদালতে মামলা করা যাবে এবং ৯০ দিনের
মধ্যে বিষয়টির চূড়ান্ত সুরাহার কথা বলা আছে।
মনে রাখা প্রয়োজন, যাঁরা
সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশ, বিশেষ করে নারী, ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘু
এবং সমাজের প্রান্তিক অংশের নারী-পুরুষ ও শিশুই বেশি বৈষম্যের শিকার হয়ে
থাকে। আর যাঁরা বৈষম্য করেন, তাঁরা সমাজের সবল অংশ। এ অবস্থায় ভুক্তভোগীর
প্রতিকার পেতে হলে রাষ্ট্রের আইনি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে
যেমন কেউ অন্যায়–অবিচারের শিকার হলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন। বৈষম্যের ক্ষেত্রেও সেটি
নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া যেসব সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে মনিটরিং সেল গঠনের
কথা বলা হয়েছে, তাঁরা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। সে ক্ষেত্রে
মনিটরিং সেলে সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা কমিয়ে অধিক সংখ্যায় বেসরকারি
প্রতিনিধি নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
যেখানে নিয়ত মানুষ অন্যায় ও বৈষম্যের শিকার
হচ্ছেন, সেখানে এমন একটি আইন প্রয়োজন, যা বৈষম্য বিলোপে কার্যকর ভূমিকা
রাখবে। তাই নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে যেসব আপত্তি ও পরামর্শ এসেছে, তা আমলে
নিয়েই বিলটি চূড়ান্ত করা যেতে পারে। আইনে কোনো দুর্বলতা ও ত্রুটি রাখা চলবে
না।