প্রকৃতির সুস্বাস্থ্যে আমাদের সুরক্ষা
Published : Saturday, 16 April, 2022 at 12:00 AM
মিরাজুল ইসলাম ||
আমাদের দেশে প্রতিবছর নীরবে পালিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস।
সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আড়ালে পড়ে যায় এই বিশেষ দিবসটি।
গত ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমাদের বিশ্ব, আমাদের স্বাস্থ্য’।
আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাদামাটা কথা।
অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করলে শঙ্কা গ্রাস করবে।
পৃথিবীর পরিবেশ বিপন্ন—এই তথ্য আমাদের সবার জানা। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের স্লোগানটির আড়ালে পৃথিবীর স্বাস্থ্যের সঙ্গে আমাদের সবার স্বাস্থ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেই বিষয়টি সবাইকে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের গড়া পৃথিবীর নিজস্ব স্বাস্থ্যপ্রদ নিয়ামকগুলো যথাযথ সংরক্ষণ ও অক্ষুণ্ন রাখা না গেলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিভাবে মানবজাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে সে সম্পর্কে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
কভিড মহামারির প্রাক্কালে আশা করেছিলাম সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত জনস্বার্থ ইস্যু নিয়ে হয়তো স্বাস্থ্য দিবস পালিত হবে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা ক্রমে ভয়ংকর ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, সে সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারলাম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বে স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম কারণ এখন জলবায়ু পরিবর্তন। প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে এই আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে। মূলত পানিদূষণ, বায়ুদূষণ ও অতিরিক্ত উষ্ণ আবহাওয়াজনিত রোগের কারণে মৃত্যুর হার বাড়ছে। বিশেষ করে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে নানামুখী দূষণে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট ও মানসিক রোগের বিস্তার ঘটছে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে লক্ষ করছেন, এভাবে পৃথিবীর পরিবেশগত স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকলে বিপর্যয়ের মাত্রা ঠেকানো সম্ভব হবে না; যার প্রভাবে জনস্বাস্থ্য কাঠামোগত দিক থেকে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়ের নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য উপলক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ডক্টরস প্ল্যাটফরম ফর পিপলস হেলথ গত ৭ এপ্রিল ‘বাংলাদেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে।
সেই সূত্রে আমরা জানতে পারি, বায়ুদূষণের ফলে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবনহানি হয়। একই কারণে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার ও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়।
আমরা এরই মধ্যে অবগত হয়েছি, ঢাকা এখন পৃথিবীর অন্যতম দূষিত বাতাসের শহর। অথচ এখনো আমরা কোনো টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
সেমিনারে আরো জানানো হয়, বাংলাদেশে ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ নিয়মিত দূষিত পানি পান করছে। দেশে প্রতি পাঁচ পরিবারের মধ্যে দুটি অর্থাৎ জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসে দূষিত উৎসর পানি পান করে। এ ছাড়া জীবাণু, দূষণসহ পানি পান করা লোকের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি।
সেই সেমিনারে ইউনিসেফের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ৮৩ শতাংশ শহুরে আর ৭২ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে উন্নত পানির ব্যবস্থা আছে। বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর।
দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নদীর তীরে শিল্প স্থাপনায় বর্জ্য নিষ্কাশনের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ায় এবং আইনের প্রয়োগের অভাবে একাধারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ জলাধার, মিষ্টি পানির উৎস ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহব্যবস্থা। উদহারণ হিসেবে শীতলক্ষ্যা নদী যথেষ্ট।
একসময় এই নদীর পানি ছিল সুপেয়। চামড়ার মশকে ভরে ভিস্তিওয়ালারা পুরান ঢাকায় এই নদীর মিষ্টি পানি বিক্রি করত। ১০০ বছর পেছনেও যেতে হবে না। ঢাকার ইতিহাস ঘাঁটলে এই তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন শীতলক্ষ্যার পানিতে শিল্প-কারখানার দূষিত ও বিষাক্ত বর্জ্যের মাত্রা এতটাই বেশি, যা ফিটকিরি দিয়েও বিশুদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে ওয়াসার পানি নিষ্কাশন ও সরবরাহ নিয়ে নাগরিক অভিযোগের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। এই সবই স্বাস্থ্যগত সমস্যার অন্যতম নিয়ামক।
এখন সময় এসেছে বায়ু ও পরিবেশ দূষণের জন্য অভিযুক্ত শিল্প-কারখানা এবং অস্বাস্থ্যকর স্থাপনাগুলোকে চিহ্নিত করা।
১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের হিংকলি শহরে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের অভিযোগে প্যাসিফিক গ্যাস অ্যান্ড ইলেকট্রিক কম্পানিকে ৩৩৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। অভিযুক্ত কম্পানির ত্রুটিযুক্ত গ্যাস পাইপলাইনের কারণে খাওয়ার পানি দূষণে হিংকলি শহরে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের পক্ষ থেকে আইনজীবী এরিন ব্রোকোভিচ এই যুগান্তকারী মামলাটি পরিচালনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনা নিয়ে ২০০০ সালে হলিউডে ‘এরিন ব্রোকোভিচ’ নামে সিনেমা মুক্তি পায়। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জুলিয়া রবার্টস।
পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে ঘটনাটি আজও উদহারণ হয়ে আছে। পশ্চিমের উন্নত বিশ্বে পরিবেশগত বিপর্যয়ে স্বাস্থ্য সমস্যা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানদণ্ডে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত সামগ্রিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো, যা এখন আমলে এনেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পৃথিবী ভালো থাকলে আমরাও সুস্থ থাকব। এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া সময়ের ব্যাপার। পরিবেশ বাঁচানোর আলোচনা ও পরিকল্পনাগুলো কেবল সেমিনারের হিমঘরে আটকে থাকলে আগামী দশকের স্বাস্থ্য খাতে সমূহ বিপদ।
লেখক : তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক