ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বাসের হেল্পার থেকে জ্বীনের বাদশা
ভুক্তভোগীদের নিঃস্ব করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার
Published : Sunday, 30 January, 2022 at 12:00 AM, Update: 30.01.2022 12:18:01 AM

বাসের হেল্পার থেকে জ্বীনের বাদশাতানভীর দিপু:
বরিশাল থেকে ১৯৯৫ সালে ঢাকা আসেন এবং দীর্ঘ ৭ বছর বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করেন হোসেন। এরপর বিআরটিএ ও পাসপোর্ট অফিসে দালালের কাজ। পাশাপাশি চোরাই মোবাইলের কারবারও করতেন ঢাকার মুগদার একটি বাসায় থেকে। করোনা মহামারী শুরু হলে তার সকল ব্যবসা বন্ধ হবার উপক্রম হলে সস্তায় সাবলেট বাসা নেন নারায়ণগঞ্জে। বিভিন্ন বই পড়ে এবং মাজারের ফকিরদের দেখে জ্বীন ও ঝাড়ফুঁক সম্পর্কিত বিভিন্ন ধারণা নিয়ে সকল সমস্যার সমাধান সেজে বসেন অষ্টম শ্রেনী পাশ জাকির। কোরআন শরীফ পড়তে না জানলেও আজগুবি সব মন্ত্র বলে ঝাড়ফুঁকের নাটক করে মন ভোলাতেন প্রতিবেশি এবং ভক্তদের। শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা জ্বীনদের মাধ্যমে সমাধান করে দিবেন বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রয় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বরিশালে ৫ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে বানিয়েছেন বাড়ি। এক ভুক্তভোগীর অজান্তেই তার বড় মেয়েকে জ্বীনের প্রভাবের বিভিন্ন কথা বলে কোন ধরণের কাবিন ও সাক্ষী ছাড়াই গোপনে বিয়ে করেছে তথাকথিত এই জ্বীনের বাদশা। তার সব প্রতারণার তথ্য তুলে ধরে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেন এক ভুক্তভোগীর ছেলে। পরে র‌্যাবের তদন্তে বেরিয়ে আসে জাকির হোসেনের প্রতারণার চিত্র। গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।
বাসের হেল্পার থেকে জ্বীনের বাদশাবিভিন্ন রোগে নিরাময়, বন্দী জ্বীনকে বিতাড়িত করা, খাটাশ জ্বীনকে পাতিলবন্দী করা এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্নসময়ে ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে কথিত জ্বীনের বাদশ জাকির হোসেনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-কুমিল্লা। র‌্যাব কুমিল্লা সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন গতকাল শনিবার দুপুরে তার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, ভুক্তভোগী আবুল খায়েরের ছেলে জ্বীনের বাদশার কাছে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি র‌্যাবকে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর নারায়ণগঞ্জের তার নিজবাসা থেকে জ্বীন বন্দির কাজে ব্যবহৃত বেশকয়েকটি মাটিরপাতিল ও তাবিজ কবজ উদ্ধার করে র‌্যাব। জাকিরের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর অজান্তে তার বড় মেয়েকে প্রভাবিত করেকাবিন ও সাক্ষী ছাড়াই বিয়ের অভিযোগ রয়েছে। জাকির হোসেনের বাড়ি বরিশাল  জেলার বানারিপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুরে।
র‌্যাব জানায়, ভুক্তভোগি দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে নিজ বাড়ি চাঁদপুর কচুয়া হতে ছেলে মেয়েদের ভালো পড়াশোনার জন্য ২০১৩ সালে নারায়নগঞ্জে বসবাস শুরু করে। স্বামি প্রবাসী হওয়ায় ২০২০ সালের অক্টোবরে করোনাকালে তাৎক্ষনিক বিভিন্ন সহযোগীতা প্রাপ্তির আশায় জাকির হোসেনের সাথে আনোয়ারা মঞ্জিল নতুন মহল্লা, আবাসিক এলাকা সিদ্দরগঞ্জ নারায়নগঞ্জের বাসার ৬ষ্ঠ তলায় সাবলেটে উঠেন।এক  পর্যায়ে জনৈক ভুক্তভোগির  নিজের একটি শারিরীক ব্যাধির কথা জানান সাবলেট প্রতিবেশী নারীকে। সেই নারী তাকে অভয় দিয়ে বলেন তার কাছে রয়েছে মুশকিল আসানের উপায়। কারণ তার স্বামীই নাকি বিভিন্ন রোগের ঝার ফুঁক করেন। পরে প্রতিবেশী নারীর স্বামী জাকির হোসেনের শরণাপন্ন হন তিনি। কেবল ঝাড়ফুঁকেই তুষ্ট হয়ে জাকিরের প্রতি অগাধ ভক্তি জমে তার। জনৈক ভুক্তভোগিকে সে জানায় তার ওপর ভর করে জ্বীনের মহান বাদশা।  ডাকলেই জাকিরের কাছে চলে আসে একের পর এক জ্বীন। আর তাদের মাধ্যমেই অনেক অসাধ্য সাধন ও রোগের চিকিৎসা করেন তিনি। জনৈক ভুক্তভোগি এসব জেনে  ভক্তিতে শ্রদ্ধায় পুরোপুরি দূর্বল হয়ে পড়েন কথিত জ্বীনের বাদশা জাকিরের ওপর। তাই এবার নিজ মেয়ের একটি সমস্যা নিয়ে আবারও তিনি জাকিরের কাছে যান। তবে জাকির এবার ঝাড়ফুঁক নয়।করতে চান আরো বড় কিছুর আয়োজন। প্রাথমিকভাবে নিজ খরচেই ব্যবস্থা করেন জ্বীন আমন্ত্রণের আয়োজন।
কিন্তু প্রথমবার কথিত জ্বীন এসে যা বলে গেলো তাতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় জনৈক ভুক্তভোগি পরিবারে। আবারো তিনি শরণাপন্ন হন জাকিরের। কারণ তার ধারণা  সমস্যার সমাধান না করলে মেয়ের ঘোর বিপদ অবশ্যম্ভাবী। জাকির জানান আবারো তিনি জ্বীনের বাদশাকে ডাকবেন। আবারো আসরের আয়োজন করতে হবে। কিন্তু এবার বিনা খরচে জ্বীনের বাদশা আসবেন না। লাগবে ৫ লক্ষ টাকা। এভাবে বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন কৌশলে হাতিয়ে নেন ২৫ লক্ষ টাকা।
জনৈক ভুক্তভোগি বাসায় বেড়াতে আসে তার বোনের মেয়ে ।জাকিরের চোখ পড়ে বোনের মেয়ের দিকে। কারণ এবার বোনের মেয়ে ওপরও ভয়ংকর জ্বীনের আছর দেখতে পেয়েছেন তিনি। জীনে মেরা ফেলাসহ বিভিন্ন প্রতারনার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকেও ছয় মাসে হাতিয়ে নেন ৫০ লক্ষ টাকা। পরে পূর্বের সকল টাকা ফেরতসহ কয়েকগুন বৃদ্ধিকৃত টাকা ফেরত পাওয়া ও আলৌকিক সম্পদ প্রাপ্তির প্রলোভন দেখিয়ে আরো ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তাদের কাছ থেকে। সকল সহায় সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া টাকা বৃদ্ধিসহ ফেরত না আসায় ভোক্তভোগি বিষয়টি পবিরারের অন্য সদস্যদের জানায়। পরে পরিবারের সদস্যরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে তাদের জানায়। বিষয়টি নিয়ে ২২ জানুয়ারি র‌্যাব-১১ সিপিসি-২ কুমিল্লা ক্যাম্পে ঘটনার বিবরণ দিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।অভিযোগের প্রেক্ষিতে ছায়া তদন্ত শুরু করে র‌্যাব-১১, সিপিসি-২। পরের‌্যাব বিশেষ তৎপরতায় তাকে আটক করে।