Published : Sunday, 12 December, 2021 at 12:00 AM, Update: 11.12.2021 11:55:44 PM


আব্দুল মমিন সরকার ||
৪
ডিসেম্বর কুমিল্লার দেবীদ্বার এলাকা সম্পূর্ণ এবং চান্দিনা সদরসহ
দেবীদ্বার সংলগ্ন বিস্তীর্ন এলাকা মুক্ত হলেও ৮ ডিসেম্বর চান্দিনায় ১২০০
পাকিস্তানী সেনার আত্মসমর্পন, ১২ ডিসেম্বর ফাঐ যুদ্ধ, ১৫ ডিসেম্বর
ইলিয়টগঞ্জ যুদ্ধ ৩টি ঘটনাই ছিল উল্লেখযোগ্য ও স্মৃতিবহুল। তন্মধ্যে ১২
ডিস্মেবর ফাঐ যুদ্ধ ছিল এক অনন্য ঘটনা। চাঁদপুর থেকে পলায়নপর পাকি বাহিনীর
দলছুট ৬/৭ জন সেনা বিগত দিনের ন্যায় বাড়ীঘরে আগুন দিয়ে আর এলোপাথারি
বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে ছুড়তে উত্তর দিকে চান্দিনা সদর বরাবর
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের দিকে এগুচ্ছিল। ৪ তারিখের পর থেকে মুক্ত এলাকার
সর্বত্র অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা চান্দিনার মাইজখার ইউনিয়নের ফাঐ এলাকার
একটি কাটা ধান খেতের খালি মাঠের অপেক্ষাকৃত নীচু ডোবায় আশ্রয় নেওয়া তাদের
চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলি । বিকাল নাগাদ শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। একপর্যায়ে
পাকি সৈন্যরা আত্মসমপর্নের প্রস্তাব দেয়। তাদেরকে যুদ্ধরীতি অনুযায়ী অস্ত্র
রেখে নিরাপদ দূরত্বে না সরিয়েই হাত মেলান উর্দু বলায় পারদর্শী মাত্র ক‘দিন
আগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৯৮ জন সাথীসহ পালিয়ে আসা সেনা বাহিনীর নায়েক
সৈয়দ আহমদ। এর মধ্যেই বিগত নয় মাসে অত্যাচারিত বিক্ষুব্দ সাধারণ জনতা যার
যা হাতের কাছে ছিল লাঠিসোটা, দা, কুড়াল নিয়ে পাকিদের উপর ঝাপিয়ে পরে
এলোপাথারি পিটাতে শুরু করে। কোনভাবেই তাদের নিরস্ত করা গেলনা। পাকিরা
বেগতিক এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনে আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিল। তাদের সাথে
ধ্বস্থাদস্তির একপর্যায়ে একটি গুলি সৈয়দ আহমদের পায়ের উরু ভেদ করে বেরিয়ে
যায়। সে তৎক্ষনাৎ লুটিয়ে পড়েও গায়ের জামা ও গেঞ্জিখুলে ক্ষতস্থান বেধে রক্ত
বন্ধ করার চেষ্টা করে। এর মধ্যেই পাকি সেনাদের একজন তার বুকে বেয়নেট চার্জ
করে। বক্ষ বিদীন করা তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে ফাঐয়ের মাটি রঞ্জিত
করে।সহসাই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।গুলি ও কোলাহল থেমে যাওয়া কুয়াশা ঘেরা
শীতের সন্ধ্যা শেষে আবছা অন্ধকারে আহতদের নিয়ে সবাই চলে গেলেও নিথর দেহের
সৈয়দ আহমদ, কাজী আবদুল লতিফ-এর নিষ্প্রান দেহ ৬ জন পাকি সৈন্যের লাশের পাশে
পরে রইল্ । অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা শত্রুর ভয়ে কেউ আর কোন খোজ নিতে সাহস
হয়নি। পরদিন সকালে শত্রু সেনা খতম নিশ্চিত জেনে শহীদ সৈয়দ আহমদের লাশ নিয়ে
মহাসড়কে মিছিল করে মাধাইয়া হাইস্কুল মাঠে চান্দিনা-দেবিদ্বার দুই থানাসহ
আশেপাশের এলাকার বিশাল গণজমায়েতে জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাধাইয়া
বাজার মসজিদের সামনের দেয়াল ঘেষে তাকে নিজের হাতে কবর দেই। শহীদ সৈয়দ আহমদ,
পিতা রোশন আল, গ্রাম-নাওতলা, চান্দিনা, কুমিল্লা ছিল আমার স্কুলের সহপাঠী ও
ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রখ্যাত ফুটবলার, বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ সৈয়দ আহমদ আন্তঃস্কুল
ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক চ্যাম্পিয়ন
হয়েছিল।
শহীদ কাজী আবদুল লতিফ, পিতা-কাজী মোঃ কেরামত আলী,
গ্রাম-রাজামেহার, দেবিদ্বার, কুমিল্লা ছিলেন তৎকালীন ই পি আর এর নায়েক।
যশোহর সীমান্তে কর্মরত থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে পালিয়ে
এসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানায় ১৯৭০ এর নির্বাচনে
চান্দিনা-দেবিদ্বার থেকে নির্বাচিত এম এন এ ক্যাপ্টেন সুজাত আলী প্রতিষ্ঠিত
মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ট্রেনিং শেষে
ক্যাম্প গুটিয়ে তিনিও দেশে ফেরেন। ১২ ডিসেম্বর বিকেলে লোক মুখে খবর পেয়ে
তিনি অস্ত্রহাতে কাউকে কিছু না বলে পাগলের মতো ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে
ফাঐযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তার মরদেহ পাকিসানী সৈন্যদের পাশে
পড়েছিল। তার মাথার চুলছাট ও চেহারায় পাকিদের সাথে মিল থাকার কারনে তার
বাড়ী থেকে দূরবর্তী এলাকায় অপরচিতরা তাকে পাকি সৈন্য মনে করে লাশ এড়িয়ে
যায়। পরদিন দুপুর পর্যন্ত কোন খবর না পেয়ে ফাঐ যুদ্ধের মাঠে তার মরদেহ
সনাক্ত করা হয়। বিকেল বেলা মিছিল সহকারে নিজগ্রাম রাজামেহার-এ নিয়ে জানাজা
শেষে দাফন করা হয়। চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৪ দিন আগে নয়মাসের বন্দিদশা থেকে
পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে উৎসর্গীকৃত টগবগে তরুন সৈয়দ আহমদের বিয়ের কথা ছিল
ডিসেম্বরে। জীবনের সে সাধ মিটানোর আগেই দেশমাতৃকার মুক্তির সোপানতলে জীবন
দিয়ে অমর হয়ে রইলেন শহীদ সৈয়দ আহমদ। অমর শহীদের অম্লান স্মৃতির পাতায় নাম
লেখালেন কাজী আবদুল লতিফ। বিজয় দিবসের উষালগ্নে ১২ ডিসেম্বর এলেই বেঁচে
থাকা সহযোদ্ধাদের মনে সে বেদনা বিধূর গৌরবের স্মুতি মনে পড়ে।
লেখক---বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মমিন সরকার
পরিচালক (অব.)
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।