
এ দেশে ছাত্ররাজনীতির
প্রশংসনীয় ঐতিহ্য ও সোনালি অতীত রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু
করে বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রতিটির সাফল্যের পেছনে
রয়েছে ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক অবদান।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমরা দেখতে
পাচ্ছি নেতিবাচক ছাত্ররাজনীতির কারণে আমাদের শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা
নানাভাবে কলুষিত হচ্ছে। অতীতে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির যে ভূমিকায় অবতীর্ণ
হয়েছিল সেই সহিংস আচরণ দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগেও। ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট
হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির ফাঁদে পড়ে সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ শিক্ষার পথ থেকে
বিচ্যুত হচ্ছে। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারা নিজের জীবন তো ধ্বংস করছেই,
দরিদ্র মা-বাবার স্বপ্নকে হত্যা করছে; পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে সামাজিক
গ্লানির দিকে।
ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে বহু শিক্ষার্থী প্রতিবছর প্রাণ
হারায়। জতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, দেশের ১২ সরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ-সহিংসতায় গত ১২ বছরে ৩৭
শিক্ষার্থীসহ ৩৯ জন খুন হয়েছেন। এসব ঘটনার পুরোভাগে ছিল ক্ষমতাসীন দলের
ছাত্রসংগঠন-ছাত্রলীগ। নিজেদের মধ্যে বিরোধেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হতাহত
হয়েছেন। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক। কারণ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের
‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সংগঠন ছাত্রলীগ। অভিযোগ রয়েছে, সারা দেশেই ছাত্রলীগের বহু
নেতাকর্মী হয় ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে, নয় দলীয় নেতাদের সমর্থনের সুযোগ
নিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত। এতে সংগঠনটি ক্ষমতাসীন দলের সুনামহানি হচ্ছে। অথচ
একসময় এ দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনেরই অগ্রভাগে ছিল এই ছাত্রলীগ। এই
ছাত্রলীগ থেকেই উঠে এসেছে দেশ পরিচালনাকারী বহু নেতা। বর্তমান
প্রধানমন্ত্রীও একসময় ছাত্রলীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ক্ষমতাসীন
দলে এখনো অনেক নেতা রয়েছেন, রাজনীতিতে যাঁদের হাতেখড়ি হয়েছিল ছাত্রলীগে।
ছাত্রসংগঠনটির গঠনতন্ত্রে ঘোষিত তিন মূলনীতি হলো শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি।
কিন্তু বর্তমান ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে এই তিন মূলনীতির কিছু কি অবশিষ্ট
আছে? যদি এসব মূলনীতির ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তারা এমন ঘৃণ্য
অপরাধ করে কী করে?
এই পরিস্থিতি তো এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। বিশিষ্টজনরা
বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকায় আজকের দিনের এই পরিবেশ
সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্র থাকলে সহনশীলতা
থাকে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে। সব পক্ষের মতামতের গুরুত্ব থাকে। তাই
শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাবতে হবে।
বছরের পর বছর ধরে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রসংসদের নির্বাচন হয় না। আগে ছাত্ররাজনীতিতে
মেধাবীদের পদচারণ ছিল। আর এখন মেধার চেয়ে পেশির সমাদর বেশি। একই সঙ্গে
সংগঠনের কার্যক্রমে কোনো গতিশীলতা আসছে না। তাই দেশ ও দশের স্বার্থেই
ছাত্ররাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হবে। তবে সমস্যাটির শিকড় এত গভীরে চলে গেছে
যে সমাধানে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং এ ক্ষেত্রে
ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত। ছাত্ররাজনীতিকে মূলধারায়
ফিরিয়ে আনতে শুদ্ধি অভিযান জরুরি।