
দুই বছর আগে বাংলাদেশ
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২০
জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অভিযুক্ত বাকি পাঁচজনকে দেওয়া হয়েছে
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আসামিদের সবাই বুয়েটের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের কর্মী।
তাঁদের মধ্যে ২২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি তিনজন মামলার শুরু থেকেই
পলাতক।
বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরারকে ২০১৯ সালের ৬
অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা
হয়। সেই ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট। এই ঘটনার পর সেখানে নিষিদ্ধ হয়
ছাত্ররাজনীতি। আবরারকে যে রাতে হত্যা করা হয়, তার পরদিন ২০১৯ সালের ৭
অক্টোবর তাঁর বাবা ১৯ শিক্ষার্থীকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে মামলাটি পরে ঢাকার দ্রুত
বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ স্থানান্তর করে আদেশ জারি হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের
পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে
যারা ‘পিটিয়ে পিটিয়ে অমানবিকভাবে’ হত্যা করেছে, তাদের কঠিনতম শাস্তি হবে।
দেশের
উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান বিশ্ববিদ্যালয়। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠান উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে পরিবারের পাশাপাশি দেশের মুখ
উজ্জ্বল করার জন্য। আবরারও বুয়েটে এসেছিলেন কুষ্টিয়া থেকে। হল প্রশাসনের
ওপর ভরসা করে সন্তানকে হলে তুলে দিয়ে আবরারের অভিভাবকরা অনেকটা নিশ্চিন্ত
ছিলেন। কিন্তু আবরার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই হল প্রশাসনের ভূমিকাও
প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। সেই সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি। বিশেষ করে
ছাত্রলীগের আধিপত্যবাদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন
হচ্ছে ছাত্রলীগ। একসময় এ দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনেরই অগ্রভাগে ছিল এই
ছাত্রলীগ। এই ছাত্রলীগ থেকেই উঠে এসেছে দেশ পরিচালনাকারী বহু নেতা। বর্তমান
প্রধানমন্ত্রীও একসময় ছাত্রলীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ক্ষমতাসীন
দলে এখনো অনেক নেতা রয়েছেন, রাজনীতিতে যাঁদের অনুপ্রবেশ হয়েছিল ছাত্রলীগের
হাত ধরে। ছাত্রসংগঠনটির গঠনতন্ত্রে ঘোষিত তিন মূলনীতি হলো—শিক্ষা, শান্তি,
প্রগতি। কিন্তু বর্তমান ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে এই তিন মূলনীতির কিছু কি
অবশিষ্ট আছে? সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্যের পরিচয় রাখছে, কিন্তু
ছাত্রলীগ-যুবলীগ বা দলীয় অসৎ কিছু লোক সব অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। বিশ্বজিৎ
হত্যা থেকে আবরার হত্যা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ আরো কত অপকর্মের সঙ্গে
জড়িয়ে আছে ছাত্রলীগের নাম। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে
সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ। একদল শিক্ষার্থী দেখা করে
আসার পর সম্প্রতি বাসায় ফিরে মারা যান কুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস
ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষক। অভিযোগ উঠেছে, ওই শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক
সেলিমকে লাঞ্ছিত করেছিলেন, যা তাঁকে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এ
অভিযোগে ৯ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে কুয়েট কর্তৃপক্ষ।
এভাবে চলতে
পারে না। এ মামলার বাদী আবরারের বাবা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যমকে
বলেছেন, তিনি সন্তুষ্ট। দ্রুত এই রায় কার্যকর হবে, এটাই এখন তাঁর
প্রত্যাশা। একই আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য। সব আইনি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর হবে, এ প্রত্যাশা
আমাদেরও।