আবুল খায়ের টিটু ।।
বাংলাদেশে শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কম-বেশ অনেকেরই অভিযোগ ও ক্ষোভ আছে। এর মধ্যে একটি সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের উন্মুক্ত চিন্তা করার ক্ষমতার অভাব। সনদ প্রাপ্তিই যেন মূল লক্ষ্য! প্রাথমিক থেকে প্রতিটি স্তরেই এমন চিত্র। পাশাপাশি রয়েছে পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইয়ের অভাব। শহরে এ অসুবিধা কিছুটা কম থাকলেও, মফস্বলে তা প্রকট। এ ঘাটতি পূরণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে ২০২৪ সালে বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার নামে একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন সংস্কৃতিজন, বিলেত প্রবাসী সাইফ মিঠু।
কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার বরল গ্রামে তাঁর বাড়ি। ঐ গ্রামের বরল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আলোর পথের এ অভিযাত্রা। লালমাই উপজেলার প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন করার মানসে অগ্রগামী হন তিনি। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত তাঁর বন্ধুরা তাঁকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেন। অধিকাংশ আর্থিক জোগান ব্যক্তিগতভাবে তাঁর। ২০২৬ সালের অক্টোবরে ৬৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন কাজ শেষ হয়। পূরণ হয় প্রাথমিক লক্ষ্য। লালমাই উপজেলার প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছে যায় অনিন্দ্য ও অনুপম এ উদ্যোগ। অভিনন্দন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার।
প্রকল্পটিকে একটি মিশন বলে অভিহিত করেন প্রতিষ্ঠাতা সাইফ মিঠু। শিশুদের মনন ও জ্ঞান বিকাশের একটি মিশন। শিশুদেরকে পাঠ্য বইয়ের বাইরের বইয়ের সাথে পরিচিত করা এর মূল লক্ষ্য। এ পরিচয় শিশুদের চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। শিশুরা আলোর পথে এক অনিন্দ্য অভিযাত্রায় শামিল হয়। ১০০ থেকে ১৫০ টি বইয়ের প্রতিটি সমাহারে শিশুদের উপযোগী গল্প, উপন্যাস, কবিতা, জীবনীসহ নানা প্রকারের বই থাকে। বই ধার নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় পাঠাগার প্রদত্ত একটি রেজিস্টার। বছর শেষে সবচেয়ে বেশি বই পাঠ করা শিশুদের বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় বিশেষ পুরস্কার।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায় এ উদ্যোগকে। সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের এ অনিন্দ্য আলোর স্ফুলিঙ্গ। কচিকাঁচা শিশুরা নতুন বই হাতে পেয়ে নতুন ভুবনে যাত্রা করে। কেউবা বিশপের একশ গল্প পড়ে বিভিন্ন চরিত্রে ডুব দেয়। কেউবা ছন্দে ছন্দে ছড়া পড়ে আনন্দে উছলে ওঠে। কেউবা প্রখ্যাত কোন মানুষের জীবনী পড়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। যত্ন সহকারে বই পড়ে, এবং তা পাঠাগারে ফেরত দিয়ে- এক অনন্য পাঠ-সংস্কৃতি গড়ে তুলছে আমাদের এ শিশুরা। বড় হতে হতে এ শিশুরাই অধিকতর জ্ঞান অর্জন ও তা বিতরণের অভ্যাসও গড়ে তুলবে। ধীরে ধীরে অর্জিত হবে একটি সৃজনশীল, মুক্তমনা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ।
বড় কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ কাজ নয়। বইয়ের তালিকা প্রস্তুত, বই ক্রয় করা এবং তা প্রতিটি বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়ার কাজটি লন্ডন থেকে সমন্বয় করেন প্রতিষ্ঠাতা সাইফ মিঠু। ছুটিতে দেশে গেলে পরিদর্শন করেন কিছু বিদ্যালয়। কথা বলেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে। মাত্র দুবছরে ৬৭ টি বিদ্যালয়ে পাঠাগার চালু করা এবং নিয়মিত তদারকি করার এ কাজটি সমন্বয় করেন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের সেক্রেটারি কামাল হোসেন এবং কোঅর্ডিনেটর ইয়াকুব আলী নিমেল। মাঠের কাজটি তদারককারিদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার শেষ নেই প্রতিষ্ঠাতা সাইফ মিঠুর। তাঁদের কাজ ও প্রচেষ্টার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন তিনি। সাইফ মিঠুর কাছে ৬৭ টি বিদ্যালয়ে পাঠাগার স্থাপনকাজ সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। তিনি বলেন, “একদিন যুক্তরাজ্যে নিজের মেয়েকে স্কুল থেকে তিনটি বই নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখেছিলাম। তার রিডিং রেকর্ডে বাবা হিসেবে স্বাক্ষর করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিলÑ বাংলাদেশে গ্রামের একটি শিশুও যদি এমন সুযোগ পেত! সেই একটি প্রশ্ন থেকে শুরু। তারপর একটি বিদ্যালয়। তারপর আরেকটি। এভাবে ১০, ২০, ৩০, ৫০...। আজ ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।” তাঁর বক্তব্যে সন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। কেন নয়? এ যে এক ইতিবাচক মাইলফলক। বরল থেকে শুরু হয়ে ভূশ্চি সমবায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ হয় এ মাইলফলক।
নগরের কেন্দ্র থেকে একটু দূরে, প্রান্তিক এ সজীব শিশুদের স্বপ্নের দুয়ার উন্মোচনের এ প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায়। জয়তু বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার।
আলোর পথে অনিন্দ্য এ অভিযাত্রা অব্যাহত থাকুক।
