মো. হাবিবুর রহমান ।।
সকাল মানেই ঘুম জড়ানো চোখে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। কাগজের খোঁচায় একটুখানি শব্দ করে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বা বারান্দায় খবরের কাগজ ফেলে যাওয়ার সেই মানুষটি আর কখনো আসবেন না। ৩২ বছর ধরে যিনি রোজ ভোরে মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন দেশ-বিদেশের সুখ-দুঃখের হাজারো খবর, আজ সেই খবরের ফেরিওয়ালা নিতাই চন্দ্র সাহা নিজেই খবরের কাগজের এক নিথর পাতা।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়নের হোসেনতলা গ্রামের নিতাই চন্দ্র সাহা (৬৫) আর নেই। সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত নানা রোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পেছনে রেখে গেছেন স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী।
যাঁদের হাত ধরে খবরের কাগজ পাঠকের ডিনারে কিংবা চায়ের কাপে পৌঁছায়, সেই হকার বা পত্রিকা বিক্রেতাদের জীবনটা পর্দার আড়ালের এক দীর্ঘ কাব্য। নিতাই চন্দ্র সাহার জীবনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা তীব্র শীত প্রকৃতির কোনো বৈরীতাই তাঁর কাঁধে ঝোলানো পত্রিকার ঝোলা আটকাতে পারেনি। ৩২ বছর ধরে এই পেশাই ছিল তাঁর সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন। প্রতিদিন ভোরে মানুষের দ্বারে দ্বারে সংবাদ পৌঁছে দিয়ে যে সামান্য উপার্জন হতো, তা দিয়েই চলত তাঁর অতি সাধারণ জীবন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিতাই চন্দ্র সাহার পরিবারে যেন খবরের কাগজ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বড় ভাই সুভাষ চন্দ্র সাহাও এই পেশার সঙ্গেই যুক্ত; উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন তাঁর একটি পত্রিকার স্টল রয়েছে। দুই ভাই যেন জীবনভর খবরের সঙ্গেই নিজেদের জীবনকে বেঁধে রেখেছিলেন।
নবীপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শাহজাহান বলেন, নিতাই সাহা কেবল একজন পত্রিকা বিক্রেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এলাকার একজন পরোপকারী ও সজ্জন ব্যক্তি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর সততা ও কর্মনিষ্ঠা সবার নজর কেড়েছিল। কিন্তু খবরের কাগজের পাতায় প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের বড় বড় সাফল্যের কিংবা সংকটের খবর ছাপা হলেও, এই পরিশ্রমী মানুষটির নিজের জীবনের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের খবর হয়তো কখনো কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রধান পাতার শিরোনাম হয়নি।
উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, নিতাই চন্দ্র সাহা আজ বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর কাঁধে ঝোলা সেই পত্রিকার বোঝা আর ঘামে ভেজা শান্ত মুখটি মুরাদনগরবাসীর মনে চিরকাল রয়ে যাবে একজন নিভৃতচারী সংবাদকর্মী ও সংগ্রামী মানুষ হিসেবে।
