
১.মুসলমান সমাজ কেবলই ভুল করেছে- আমার কবিতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বকে অর্থাৎ আমার ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে। আমি মুসলমান - কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের সকল কালের সকল জাতির। কবিকে হিন্দু-কবি, মুসলমান কবি ইত্যাদি বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি ।
কাজী নজরুল ইসলাম । পত্র নং -চৌদ্দ :, বা এ, নজরুল -রচনাবলী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯
২. ২০০০ সালে আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত সাবেক এনএসআই প্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল এম এ মতিনের লেখা ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা‘ নামের বইতে তিনি লিখেছেন,
১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলিকাতার গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। এখানে বলা প্রয়োজন যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বও সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।...
এই হচ্ছে বিরোধীদের পুঁজি।
উপর্যুক্ত লেখকের এই মন্তব্যের সূত্র তথ্য প্রমাণ চেয়ে তাঁর বক্তব্যেকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
৩.রবীন্দ্র-জীবনী ঘেঁটে এবং অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো, প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে ১৯১২ সালে ২৮ মার্চ এ ধরনের সভায় সভাপতিত্ব করা দূরের কথা , উপস্থিত থাকাই সম্ভব ছিল না। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ রবীন্দ্রনাথের কলকাতা থেকে ‘সিটি অব প্যারিস‘ জাহাজে তাঁর ইংল্যাণ্ড যাওয়ার কথা। কিন্তু ১৯ মার্চ থেকে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন বিধায় যাওয়া হয়নি।
ডাক্তারের পরামর্শে রবীন্দনাথ কলকাতা থেকে শিলাইদহে চলে যান ১১ চৈত্র, ২৪ মার্চ। ২৫ মার্চ তিনি কাদম্বিনী দেবীকে চিঠি লিথেন। ২৮ মার্চ ১৯১২ সালে শিলাইদহ থেকে জগানন্দ রায়কে চিঠি লেখেন। ওই দিন থেকে তিনি শিলাইদহে গীতিকবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর গীতিমাল্য কাব্যগ্রন্থে ‘স্থির নয়নে তাকিয়ে আছি‘ কবিতাটির নিচে লেখা আছে, ‘শিলাইদহ ১৫ চৈত্র ১৩১৮, ২৮ মার্চ ১৯১২। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থেও একই তারিখ আছে। এখন কথা হলো, ২৮ মার্চ যিনি শিলাইদহে বসে কবিতা লিখছেন তার পক্ষে একই দিনে গড়ের মাঠে উপস্থিত থাকা, সভাপতিত্ব করা কি করে সম্ভব ? উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ সে-সময় ১২ এপ্রিল পর্যন্ত শিলাইদহে ছিলেন।
৪. আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সেদিন পথে নেমেছিল হিন্দু সংবাদপত্রগুলি, হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতাগণ। গিরিশচন্দ্র ব্যানার্জি, রাসুবহারী ঘোষ, আশুতোষ মুখার্জি । তাঁর নেতৃত্বে লর্ড হার্ডিঞ্জকে ১৮ বার স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল।
৫. প্রশ্ন হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অভিজাত ব্যক্তিদের আমন্ত্রণে ঢাকা সফরে যান। সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্ররা রবীন্দ্রনাথকে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী কবিকে মুসলিম ছাত্ররা সংবর্ধনা দিতেন ? রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন ? ঢাকায় রবীন্দ্রনাথকে অনেক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কিন্তু সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররা সকলকে হার মানিয়ে দেয়।
(বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন : দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে : আকবর আলি খান : প্রথমা : পৃষ্ঠা : ৪৯-৫৩
