‘উইকেটে তেমন কিছুই নেই, বড় ইনিংস খেলা জরুরি’- ধারাভাষ্যে রমিজ রাজা যখন এই কথা বলছেন, ৬৫ রানে অপরাজিত সাদমান ইসলাম। তার ব্যাটেই হয়তো বড় কিছুর সম্ভাবনার কথা বলছিলেন রমিজ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শর্ট বলের ফাঁদে পা দিয়ে বসেন অভিজ্ঞ ওপেনার।
সাদমান একাই নন, একই পথের পথিক তানজিদ হাসান, লিটন কুমার দাস, মুমিনুল হক ও নাজমুল হোসেন শান্ত। ভালো শুরুর পরও কেউ পারেননি ইনিংস টেনে নিতে। তাই প্রথম দিন শেষে বড় ইনিংস খেলতে না পারার আক্ষেপ রইল বাংলাদেশের।
আবু ধাবির জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুক্রবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে এমনিতে খুব বেশি খারাপ অবস্থায় নেই বাংলাদেশ। দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ৩১৭ রান। আবু ধাবির মাঠে টেস্টের প্রথম দিনে যা সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।
২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দিনে ৩ উইকেটে ৩০৭ রান করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রায় ১৬ বছর পর সেটি ছাড়িয়ে গেলেও বাংলাদেশের কোনো ব্যাটার তিন অঙ্ক ছুঁতে পারেননি। সম্ভাবনাময় সব ইনিংসের অপমৃত্যু ঘটে আলসে ব্যাটিংয়ে।
তীব্র গরমে ম্যাচের শেষ দিকে স্পিনের প্রভাব থাকবে বেশি, সেই ভাবনায় হয়তো টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে নেন শান্ত। স্পিনে শক্তি বাড়াতে সফরসঙ্গী রিজার্ভ হিসেবে যাওয়া নাঈম হাসানকে প্রায় ১৬ মাস পর একাদশেই জায়গা করে দেয় বাংলাদেশ।
বিপরীতে আফগানিস্তানের বোলিং লাইনআপে অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট। তাদের পাঁচ বিশেষজ্ঞ বোলার মিলে খেলেছেন মোটে ১৮টি টেস্ট। তুলনামূলক আনকোড়া এই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তাণ্ডব চালান তানজিদ।
দ্বিতীয় ওভারে মোহাম্মদ সালিমের বলে গ্লান্স করে মারা বাউন্ডারিতে শুরু। ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের বলে তিনি হাঁকান জোড়া চার। একই বোলারের বল ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে কভারের ওপর দিয়ে ওড়ান ছক্কায়।
ছন্দ ধরে রেখে হাশমতউল্লাহ শাহিদির স্পিনে চারের পর তিনি মারেন ছক্কা। দশম ওভারেই পূর্ণ হয়ে যায় বাংলাদেশের পঞ্চাশ রান। ৪১ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পঞ্চাশ করেন তানজিদ।
এর ফাঁকেই অবশ্য ব্যক্তিগত পাঁচ রানে জীবন পান সাদমান। এরপর আরও সাবধানী হয়ে এগিয়ে যান ৩১ বছর বয়সী ওপেনার।
লাঞ্চ বিরতির আগেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করার বিরল কীর্তির সম্ভাবনা জাগান তানজিদ। কিন্তু হঠাৎ সরে যায় মনোযোগ। ইসমাত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে দূর থেকে আয়েশি ভঙ্গিতে ড্রাইভের চেষ্টায় কট বিহাইন্ড হন ৮ চার ও ৪ ছক্কায় ৭১ বলে ৮৩ রান করা ওপেনার।
১২৪ রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর দলকে এগিয়ে নেন সাদমান-মুমিনুল। দুজন মিলে গড়েন ৯০ বলে ৬০ রানের জুটি। ৮ ইনিংস পর পঞ্চাশ ছুঁয়ে বড় কিছুর আশা জাগিয়ে তোলেন সাদমান।
তবে লাঞ্চ বিরতির পর সালিমের শর্ট বলের ফাঁদে আটকা পড়েন অভিজ্ঞ ওপেনার। পুল করার চেষ্টায় শর্ট মিড উইকেটে ধরা পড়েন সাদমান। ক্যারিয়ারের নবম ফিফটিতে ৬৭ রান করেন তিনি।
ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে থিতু হতে সময় নেননি মুমিনুল ও শান্ত। কাইস আহমাদের বল ছক্কায় উড়িয়ে যাত্রা শুরু করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। মনে হচ্ছিল, দুই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের জুটিতে বড় সংগ্রহের দিকে ছুটবে বাংলাদেশ।
তবে তাদের নিজেদের ভুলেই সেটি হয়নি। চা বিরতির আগে চার ওভারের এক ঝড়ে শেষ হয় সেই আশা। ইয়ামিনের বলে আলতো ড্রাইভে শর্ট কভারে ক্যাচ দেন ৩৯ রান করা মুমিনুল। এক ওভার পর ইয়র্কার ধরনের ডেলিভারিতে মন্থর রিফ্লেক্সে বোল্ড হন মুশফিকুর রহিম।
শুরু থেকেই কাইসকে সাবলীলভাবে খেলতে থাকা শান্ত হঠাৎই এক লেগ স্পিনে বোকা বনে যান। তার ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে বল স্লিপে ফিল্ডারের হাতে জমা পড়ে।
চার রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারানোর পর হাল ধরেন লিটন ও মেহেদী হাসান মিরাজ। নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে আরও একবার পঞ্চাশছোঁয়া জুটি গড়েন তারা দুজন।
লিটন-মিরাজের আগের তিনটি পঞ্চাশছোঁয়া জুটিই শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল শতরানে। এবার আর তা হয়নি। ইসমাতের অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারি জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলে স্টাম্পে টেনে আনেন মিরাজ। তার বিদায়ে ভাঙে ৬২ রানের জুটি।
অন্য প্রান্তে লিটন ছিলেন অবিচল। অস্ট্রেলিয়া সফরে টানা তিনবার শূন্য রানে আউট হওয়া স্টাইলিশ এই ব্যাটার এদিন চমৎকার ব্যাটিংয়ে পান ফিফটির দেখা। তবে তানজিদ, সাদমানের মতো তিনিও ইনিংস টেনে নিতে পারেননি।
সালিমের শর্ট বল পুল করে ডিপ ফাইন লেগে ধরা পড়েন বাংলাদেশের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। এতে অবশ্য বোলারের চেয়ে বেশি কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন বাম দিকে ঝাঁপিয়ে চমৎকার ক্যাচ নেওয়া ইয়ামিন। ৪টি চারে ৮৯ বলে ৫৩ রান করেন লিটন।
একই ওভারে নিখুঁত ইয়র্কারে হাসান মাহমুদকে বোল্ড করেন সালিম। পরে দিনের বাকি চার ওভারে আর বিপদ ঘটতে দেননি নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১২ রান নিয়ে নতুন দিনের খেলা শুরু করবেন শেষ দিকের এই দুই ব্যাটসম্যান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (প্রথম দিন শেষে)
বাংলাদেশ: ৮৪ ওভারে ৩১৭/৮ (সাদমান ৬৭, তানজিদ ৮৩, মুমিনুল ৩৯, শান্ত ২৯, মুশফিক ০, লিটন ৫৩, মিরাজ ২৪, নাঈম ১১*, হাসান ২, তাইজুল ৪*; ইয়ামিন ১৬-৩-৬২-২, সালিম ১৯-১-৭০-৩, শাহিদি ৩-০-২৪-০, ইসমাত ১২.৪-৫-২০-২, জিয়া ১৯-১-৭৭-০, কাইস ১৪.২-১-৬০-১)
