
‘ক্লাসে ওর সঙ্গে আমি একসঙ্গে বসতাম। ক্লাসে অপ্রতিম যেখানে বসত, সেখানে বেঞ্চের ওর নাম লিখে রাখছে সে, আমরা কেউ তার জায়গায় বসতাম না। অপ্রতিম অনেক ভালো ছাত্র ছিল। স্যার যে পড়াগুলো দিতেন, সেগুলো সে প্রতিদিন এসে স্যারের কাছে বলত। আজকে বন্ধুটাকে শেষ বিদায় দিতে এসেছি।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কোটবাড়ি গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে এ কথাগুলো বলছিলো অপ্রতিমের সহপাঠি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো.আরিফুল ইসলাম। এসময় অপ্রতিমের ক্লাসের অন্তত ১৫-২০ জন সহপাঠি উপস্থিত ছিলেন।
আরিফুল আরও বলেন, শুক্রবার বিকালে ফেসবুকে যখন দেখলাম অপ্রতিম নিখোঁজ, তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার মতো ছেলে না, নিশ্চয়ই ওকে কেউ কিছু করেছে।’ এই কথা বলতে বলতে থেমে যায় আরিফ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করে সে। অপ্রতিমের সঙ্গে কাটানো শেষ সময়ের কথা মনে করে আরিফ বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলেছি। তখন তো বুঝতেই পারিনি, এটাই ওর সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। স্কুলে কোন অনুষ্ঠান হলে আমরা এক সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, হাসাহাসি করতাম। অপ্রতিম আর আমাদের মাঝে নেই এই বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) কুমিল্লা বিশ্বাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী একেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
মো.সিয়াম নামে অপ্রতিমের অপর এক সহপাঠি বলেন, অপ্রতিমকে শেষবারের মত বিদায় দিতে এসে বুক কেঁপে উঠছে। এত তারাতারি তাকে বিদায় দেব এটা ভাবতেও পারেনি। ক্লাসে তার শূন্যতা কোনদিনও পূরণ হবে না। আমাদের ক্লাসে প্রায় ৯০ জন সহপাঠি আছে, আমরা সবাই তার জন্য কেঁদেছি। অপ্রতিমকে যেভাবে যারা হত্যা করেছে আমরা ঠিক সেভাবেই তার হত্যাকারীদের বিচার দেখতে চাই। এদিকে, সকাল ৯টার দিকে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার নুরজাহান ভিলায় অপ্রতিমের লাশবাহী গাড়ির সামনে ভিড় করছিলেন অপ্রতিমের ক্লাসের সহপাঠিরা। তখনো বাড়ির তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট অপ্রতিমের মায়ের আহাজারির আওয়াজআসছিলো। অপ্রতিমের শেষ বিদায় মুহুর্তে মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছিলো পরিবেশ। পরে সকাল পৌনে ১০টার দিকে অপ্রতিমের লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের উদ্দেশে বাড়ি ছেড়ে যায়। ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গাড়িটি কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার আসে। গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমের দাফন সম্পন্ন হয়।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। গতকাল শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
