
সরকারি কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে বড় মাত্রায় বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতেও বেতন ও মজুরি সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় পরিসরে বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই।
ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন ব্যবধান, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয়-তিন দিক থেকেই চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারি পে স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
তবে সরকারি চাকরিতে বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে একই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কর্মীদের বেতন নিয়ে বেসরকারি খাতেও তুলনা তৈরি হয়। বিশেষ করে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেতন-ভাতা পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলানিউজকে বলেন, সাধারণত সরকারি পে স্কেল পুনর্র্নিধারণ হলে বেসরকারি খাতেও এর একটি চাপ তৈরি হয়। পরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগে মজুরি বা বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে।
তবে এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন যে মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে, সেটি বেসরকারি খাতের জন্য অনুসরণ করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর নিচের গ্রেডগুলোতে বেতন বাড়ানোর যে যৌক্তিকতা ছিল, তা থাকলেও ওপরের গ্রেডগুলোতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই মাত্রার বেতন বৃদ্ধিকে বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের পক্ষে এখনই একইভাবে পে স্কেল সংশোধন করার সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না।
নিচের গ্রেড হতে পারে বেঞ্চমার্ক:
নতুন পে স্কেলের পুরো কাঠামো অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও নিচের গ্রেডের বেতন বেসরকারি খাতের জন্য একটি মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
নতুন বেতনস্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে হয়েছে ৩২ হাজার টাকা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণকে বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি পুনর্র্নিধারণের ক্ষেত্রে একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এ ধরনের বেঞ্চমার্ক বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের কর্মী ও শ্রমিকেরা মজুরি পুনর্র্নিধারণের জন্য মজুরি বোর্ডের কাছেও যেতে পারেন।
তবে সরকারি পে স্কেলের পুরো মাত্রার বেতন কাঠামো গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা বেসরকারি খাতের নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমবেশি এর সঙ্গে সমন্বয় করতে হতে পারে।
বড় বেতন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ কোথায়
দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সীমিত। নতুন বিনিয়োগও কম হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের পরিস্থিতি অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকারি পে-স্কেলের পুরোটা অনুসরণ করে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো কঠিন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানো মানে শুধু কর্মীর হাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া নয়। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমব্যয় বাড়ে। বাড়তে পারে কর্মী-সুবিধা, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ও। ফলে বেতন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজারের প্রতিযোগিতা ও পণ্যের দাম-সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।
এ কারণে বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে পারলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা করা কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন পে স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠান ও খাতভেদে ভিন্ন হতে পারে।
সরকারি বেতন বাড়লে বাজারেও প্রভাব
সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার ফলে তাদের ভোগব্যয় বাড়তে পারে। এতে পণ্য ও সেবার চাহিদায় পরিবর্তন আসতে পারে। বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে কিছু পণ্য ও সেবার দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তখন বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের হাতে সরাসরি বাড়তি অর্থ যাবে না। কিন্তু বেতন প্রতিযোগিতা, দক্ষ কর্মী ধরে রাখার ব্যয়, পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মাধ্যমে তাঁদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
সবার বেতন একই হারে বাড়বে না
নতুন পে স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে একরকম হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তারা দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন-ভাতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অনেকের পক্ষে তা করা সম্ভব নাও হতে পারে।
ফলে সরকারি চাকরিতে যেখানে নতুন বেতনস্কেলের প্রভাব সরাসরি ও বিধিবদ্ধ, বেসরকারি খাতে তা হবে মূলত বাজারনির্ভর। কোথাও বেতন বাড়তে পারে, কোথাও কেবল বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাড়তে পারে, আবার কোথাও বেতন কাঠামো অপরিবর্তিতও থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন পে স্কেলের বড় প্রশ্নটি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়া নয়। এর প্রভাব বেসরকারি শ্রমবাজার কতটা সামলাতে পারবে, সেটিও। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের চাপ তৈরি হলেও অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেই চাপ কতটা পূরণ করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় বিষয়।
