রোববার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
তুহিন আনাস ফাহিমই সন্দেহভাজন ঘাতক?
কুমিল্লার কাগজ রিপোর্ট ।।
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪১ এএম আপডেট: ২০.০৯.২০২৬ ২:১২ এএম |

তুহিন আনাস ফাহিমই সন্দেহভাজন ঘাতক?
কুমিল্লার সালমানপুরের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা তুহিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে নিহত অপ্রতিমকে ডেকে নেয় সানন্দা এলাকায় এরপর সেখানে আসা আনাস, ফাহিমসহ আরো ২/৩ জন। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটা। এর আগে জুমার নামাজের পর নিহত অপ্রতিমকে দেখা যায় কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের মূল ফটকের সামনে। সম্ভবত এরপরই সে তুহিনের অনুরোধে সাড়া দেয়। 
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য। সূত্র জানায়, তুহিনের ম্যাসেঞ্জারে নিহত অপ্রতিমের সাথে শেষ মুহূর্তের কথপোকথনের তথ্য পাওয়া যায়। তুহিনের অনুরোধে অপ্রতিম এক ঘন্টার জন্য সানন্দায় যেতে সম্মত হয়।
সিসি ফুটেজে দেখা যায়, তুহিন অপ্রতিমকে নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির বাসার সামনে দিয়ে হেঁটে সানন্দা এলাকার দিকে যাচ্ছে। এলাকার এক সিসি ফুটেজে তুহিন ও অপ্রতিমকে ঘটনাস্থলের দিকে নির্বিঘ্নে হেঁটে যেতে দেখা যায়। এরপরই আরেক পথে আনাস ও ফাহিমকে ঘটনাস্থলে যেতে দেখা যায়। সেটিও ধরা পড়ে সিসি ফুটেজে। তারপরই ঘটে হত্যার ঘটনা। 
সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকে তুহিন, আনাস ও ফাহিম নির্ভার থাকে। সকাল ৮টার দিকে তারা তিনজনই নিহত অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে ক্রন্দনরত তার মা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা নাহিদকে সান্ত্বনা দেয়। সেখান থেকে ফিরে তারা যে যার মতো চলে যায়। তুহিন সানন্দায় নিজের বাসায় গিয়ে স্বাভাবিক সময় কাটায়। আর আনাস চলে যায় ঢাকার গাবতলীতে। 
দুপুরের দিকে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা তুহিনকে সানন্দায় নিজ বাসা থেকে আটক করে। পরে তার মোবাইলে অপ্রতিমের সাথে চ্যাটিং এবং তাকে ডেকে আনার প্রমাণ পায়। শিক্ষার্থীরা তুহিনের কাছে আনাসের কথা জানতে চাইলে সে মহিপাল নিজের বাড়িতে আছে বলে জানায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে মোবাইল ট্র্যাকিং করে গাবতলী থেকে গ্রেপ্তার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ছাড়া ফাহিমকেও গ্রেপ্তার করে।
জানা গেছে, তুহিনকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে নিয়ে ডিবি পুলিশ আবার সানন্দায় তার বাসায় যায়। সেখানে তুহিনের দেখানো স্থান থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়। 
এ দিকে কি কারণে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে তা জানাতে পারেনি নির্ভরযোগ্য সূত্রটি। তবে ধারণা করা হচ্ছে- একটি মোটরসাইকেল কেনা এবং টাকা সংগ্রহ নিয়ে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। 
সূত্র জানায়, তুহিন ও ফাহিম উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কিন্তু অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কিশোর গ্যাং কিংবা অন্য কোনো কারণে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে।
এর আগে গত  শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন মোবাইল নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই তার খোঁজ মিলছিল না। পরে রাতে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর রাতভর কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় ও লালমাই পাহাড়েরর আশপাশের এলাকায় তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধ্যান পাওয়া যায়নি। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকের স্থানীয় লোকজন জানতে পারে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দুই/তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে একজনের লাশ পড়ে আছে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। গিয়ে দেখতে পান সেখানে পড়ে আশে অপ্রতিমের মরদেহ; পাশে একটি শেয়াল। এরপর শেয়ালটিকে তাড়িয়ে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাতর মরদেহ উদ্ধার করে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি রাকিবুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বিকেলের পর থেকে অপ্রতিমতে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে জানানা পরিবারের সদস্যরা। পরবর্তীতে তার বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর থেকেই আমরা বিভিন্ন স্থানে তাকে খোঁজাখুজি করতে থাকি। পুলিশের সদস্যরা সারারাত তার সন্ধ্যান করেছে। সকাল থেকেও পুলিশের কয়েকটি টিম তাকে খোঁজে পেতে মাঠে ছিল। পরে দুপুর ১২টার দিকে আমরা জানতে পারি সালমানপুর এলাকায় একজনের মরদেহ পড়ে আছে। পরে ঘটনাস্থলে এসে তার লাশ সনাক্ত করা হয়। সেখানে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা তার মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি। এ কারণে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। যদিও হত্যার কারণ বা কারা এতে জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে অপ্রতিমের লাশ পড়ে থাকতে দেখা স্থানীয় যুবক আবদুল কাদের জিলানী বলেন, সকাল আনুমানিক ১১টা সাড়ে ১১টার দিকে আমরা প্রথমে এখানে এসে ছেলেটিকে দেখে ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে আছে। পরে কাছে গিয়ে দেখি মৃত। মৃত দেখে ভয়ে আমরা এখান থেকে চলে গেছি। পরে ফিরে এসে আমার জেঠাতো ভাইকে ঘটনা বলার পর শুনি ম্যাডামের বাচ্চা হারানো গেছে। তখন বুঝতে পারি এটা ম্যাডামেরই ছেলে। এরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, দুপুর ১২টার দিকে আমরা জানতে এখানে লাশ পাওয়াা গেছে। পরে আমরা বন্ধুরা মিলে এখানে এসে দেখি লাশ পড়ে আছে এবং একটা শেয়াল পাশে ঘুরছে। তখন আমরা শিয়ালটিকে সরিয়ে দেই। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

আমি কোন দেশে বাস করি, একটা ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলতে হবে?:
এদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জানতে চাই, আমার ছেলের কি অন্যায় ছিলো। আমি কোন দেশে বাস করি, এটা কোন দেশ? একটাা ছেলে ঘর থেকে বের হলো- তাকে মেরে ফেলতে হবে? এখন আমি কিভাবে বাঁচবো? আমার তো একটাই ছেলে, বাকি জীবন আমি কিভাবে কাটাবো?’
শনিবার ঘটনাস্থল ঘুরে সদর আসনের এমপি মনিরুল হক চৌধুরী তাদের বাসায় সমবেদনা জানাতে গেলে অপ্রতিমের মা বলেন, ‘আমার একটি মাত্র ছেলে। তাকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো।’ কুবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে বাসায় ছুটে যান। এ সময় বাবা-মায়ের বুক ফাটা কান্না ও আহাজারি দেখে অনেক চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
এমপি মনিরুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি এ এলাকার এমপি হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। এক মাসুম বাচ্চাকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবো। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।'
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, অবুঝ শিশু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এ ঘটনা আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। এ হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে আমরা সন্দেহজনক একজনকে আটক করেছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যায় জড়িততে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর ঘটনা তাই আমরা সবকিছু এখনই খুলে বলতে চাচ্ছি না। প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করে মিডিয়ার মাধ্যমে সবকিছু তুলে ধরা হবে।















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২