
হাসতে হাসতে বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে গিয়ে ছেলে আর ফিরে আসেনি বলে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন কুমিল্লায় হত্যার শিকার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
শনিবার বিকালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসায় বসে সাংবাদিকদের কাছে শুক্রবার অপ্রতিমের জুমার নামাজে যাওয়া, বাসায় ফিরে খাবার খাওয়া, তার বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়া, তার খোঁজে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি আর সবশেষ লাশ উদ্ধারের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।
এদিন দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার দক্ষিণ মোড়ে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে।
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলছিলেন, “শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজে গেল। আমরা বাসায় তার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম খাবারের জন্য। ও এলে আমি ওকে খাইয়ে দেই। সাধারণত ওর মা খাওয়ায় দেয় বা আমরা তিনজন মিলে একসঙ্গে। এই পাঞ্জাবিটা পড়া ছিল।
“খাওয়ার পরে আমি বললাম যে, ‘বাবা তুমি আজকে বাইরে যেও না, আমরা মুভি দেখি। মুভি দেখার পরে আমি তোমারে একটা ভালো ট্রিট দিব। তখন ও বলল, ‘না আব্বু, আমি একটু বাইরে যাব। আজকে বন্ধুদের সঙ্গে কিছু ছবি তুলব।’
“তখন আমি বললাম, ‘তোমার আম্মুকে বলে যাও।’ তো ও খুশি মনে দরজাটা খুলে ‘আব্বু গেলাম’, ‘আম্মু গেলাম’ বলে চলে গেল। আর ফিরে আসেনি।”
কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ছেলে ফিরে না আসা উদ্বেগ হচ্ছিল, কিন্তু আশা করছিলেন, ছেলে ফিরে আসবে। রাত ৯টায়ও ছেলে ফিরে না আসায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিবার থানায় যায় এবং থানায় জিডি করেন। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আশ্বাস দিচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররাও আশপাশের শালবনসহ বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছে। এর মধ্যে একজন রিকশায় বসে আইসক্রিুম খেতে দেখছে, কেই আবার তাকে রিকশায় করে খানবাড়ির দিকে যেতে দেখেছে।
তিনি বলেন, “আমার একটা ছেলে। বাসায় আমরা তিনজন মানুষ। সবাই বন্ধুর মত ছিলাম। ওর দুইজন হাউস টিউটর। ও বাসার বাইরে আগে একটু বেশি বেশি যেত। হাউস টিউটর রাখার পর চার-পাঁচ মাস যাবত একটু বেশি বাসায় থাকত।”
তার ধারণা, “অপ্রতিম হয়তো বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে গেছে। কিন্তু বন্ধুরা হয়ত তাকে ভিন্ন উদ্দেশে নিয়ে গেছে। ওরা হয়তো বলছে যে, ‘তুমি তো অনেকদিন আসো না। আসো, একসাথে ছবি তুলব। এটা আমার অনুমান থেকে বলছি।
“ওইভাবেই তো আমার ছেলে গেছে। পরে ওরে ওইভাবে আমাদের দেখা লাগল।”
তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে তো আমি পাব না। এটার বিচার চাই। বিচার চাই যেন পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।”
আমি কোন দেশে বাস করি, একটা ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলতে হবে?:
এদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জানতে চাই, আমার ছেলের কি অন্যায় ছিলো। আমি কোন দেশে বাস করি, এটা কোন দেশ? একটাা ছেলে ঘর থেকে বের হলো- তাকে মেরে ফেলতে হবে? এখন আমি কিভাবে বাঁচবো? আমার তো একটাই ছেলে, বাকি জীবন আমি কিভাবে কাটাবো?’
