দরুদ শরিফ হলো মুমিনের আত্মার খোরাক ও অন্তরের প্রশান্তির এক সুমহান ও বরকতময় আমল। নিয়মিত দরুদ পাঠের মাধ্যমে অন্তরে পবিত্রতা আসে, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা গভীর হয় এবং জীবন ভরে ওঠে অদৃশ্য রহমতে। স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা উম্মতকে প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়ে এর গুরুত্ব ঘোষণা করেছেন। চলুন, কুরআন ও হাদিসের আলোকে দরুদ শরিফের অসামান্য বরকত ও ফজিলত সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
কুরআনে দরুদ পাঠের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা নিজেই ফেরেশতাদের নিয়ে নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠান এবং মুমিনদেরও এই আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান; হে ইমানদারগণ, তোমরাও নবীর ওপর দরুদ পাঠাও এবং উত্তম অভিবাদন (সালাম) পেশ কর।’ (সুরা আহজাব: আয়াত ৫৬)
মর্যাদা বৃদ্ধি ও গায়েবি সাহায্য
নিয়মিত দরুদ পাঠকারীর মর্যাদা আল্লাহ তাআলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অশেষ রহমত ও ক্ষমা লাভ করে। হাদিসে পাকে এসেছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-
‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন, তার ১০টি গুনাহ মাফ করা হবে এবং ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে।’ (নাসাঈ)
ইতিহাস ও বুজুর্গদের বর্ণনায় এসেছে, দরুদ পাঠের মাধ্যমে মানুষ প্রতিনিয়ত কঠিন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায়। একবার হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) যখন রাসুল (সা.)-কে বললেন যে তিনি তাঁর দোয়ার পুরোটা সময় দরুদ পাঠে ব্যয় করবেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন-
‘তাহলে তোমার সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে এবং তোমার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি ২৪৫৭)
বিপদ-আপদ, ঋণ ও রোগ থেকে মুক্তি
দরুদ শরিফ সব ধরনের মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির পরম অমোঘ মাধ্যম। হাদিস ও আলেমদের বর্ণনায় এমন অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে অন্ধত্ব, কঠিন ব্যাধি কিংবা ঋণের সাগরে ডুবে যাওয়া মানুষ কেবল নবীজির প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠের বরকতে অলৌকিকভাবে শেফা ও মুক্তি লাভ করেছেন। এমনকি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কিংবা নির্জন প্রান্তরে ডাকাতের কবলে পড়ে প্রাণনাশের মুহূর্তেও দরুদের অসিলায় আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে গায়েবি সাহায্য নাজিল হওয়ার বহু বিবরণ ইসলামি ইতিহাসে নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়।
দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত ও কিয়ামতের দিনে সান্নিধ্য
দোয়া কবুলের অন্যতম প্রধান আদব হলো দোয়ার আগে ও পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন-
‘যে পর্যন্ত তোমরা নবীর ওপর দরুদ পাঠ না করবে, সে পর্যন্ত যেকোনো দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, ওপরে ওঠে না।’ (তিরমিজি)
কিয়ামতের কঠিন দিনে হিসাব-নিকাশের মাঠে মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার একমাত্র উপায় হলো অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন-
‘কিয়ামতের দিন আমার নিকটতম ব্যক্তি সে-ই হবে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করবে।’ (তিরমিজি)
এ ছাড়া পৃথিবীতে মুমিন বান্দা যখনই দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়োজিত ফেরেশতাগণ ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় সেই সালাম ও দরুদের তোহফা প্রিয় নবী (সা.)-এর রওজা মোবারকে পৌঁছে দেন।
কৃপণ ব্যক্তি ও দরুদ পাঠের আমল
নবীজি (সা.)-এর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা প্রতিটি মুমিনের নৈতিক ও ইমানি দায়িত্ব। এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-
‘প্রকৃত কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করে না।’ (তিরমিজি)
দরুদ শরিফ পাঠের মাধ্যমে দুনিয়ার অভাব-অনটন, ব্যাধি ও দুশ্চিন্তা যেমন দূর হয়, তেমনি আখিরাতে মিলবে নবীজির শাফায়াত ও জান্নাতের সুসংবাদ। অজু অবস্থায় পাক-পবিত্র স্থানে বসে দরুদ পাঠ করা উত্তম হলেও চলাফেরা ও যেকোনো অবস্থায় এটি পাঠ করা যায়।
দরুদ শরিফ কেবল একটি মৌখিক ইবাদত নয়, বরং এটি বান্দার সঙ্গে বিশ্বনবী (সা.)-এর ভালোবাসার এক চিরন্তন সেতুবন্ধন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, বিপদে-আপদে এবং দোয়ার প্রারম্ভে দরুদকে নিজের আমলের অংশ বানিয়ে নিলে দুনিয়ার অশান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতে মিলবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান সান্নিধ্য ও সুপারিশ। তাই আসুন, বেশি বেশি দরুদ পাঠের মাধ্যমে জীবনকে ধন্য করি।
