শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
আত্মহত্যা : ব্যক্তি সংকটের সঙ্গে সমাজেরও দায়
আবুল কাশেম উজ্জ্বল
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৭ এএম আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ১:১৩ এএম |

আত্মহত্যা : ব্যক্তি সংকটের সঙ্গে সমাজেরও দায়
 
আত্মহত্যার কারণ সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও অনেক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত দেশের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ হার প্রায় তিনগুণ বেশি। বয়সভেদে বিচার করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ও প্রবণতা অনেক বেশি। আত্মহত্যার ধরন ও কারণ যাই হোক না কেন, এসব ঘটনা আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কঠিন সত্যকে তুলে ধরে। 
বিশ্বায়নের এ যুগে প্রতিযোগিতামূলক সামাজিক ব্যবস্থা ও যান্ত্রিকতা আমাদের প্রথাগত সামাজিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধকে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করছে। এতে ব্যক্তিগত আবেগ ও উচ্চাভিলাষী চিন্তা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। যার ফলশ্রুতিতে তৈরি হচ্ছে শূন্যতা ও হতাশা; পরিণতিতে অনেকে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছে।
আমাদের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের বিখ্যাত ‘আত্মহত্যা’ তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এটি কোনো একক বা কেবল মানসিক বিষয় নয়। বরং সমাজকাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক বন্ধনের ভারসাম্যহীনতাও এর জন্য দায়ী। তার তত্ত্বে উল্লেখিত অহমবাদী আত্মহত্যা, পরার্থবাদী আত্মহত্যা, নিয়মশূন্য আত্মহত্যা ও অতি নিয়ন্ত্রিত আত্মহত্যা এই চার ধরনের আত্মহত্যার মধ্যে পরার্থবাদী আত্মহত্যা ছাড়া অন্যগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও তার পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে কেবল ব্যক্তি নিজে নয়, পরিবার ও সমাজের নানা উপাদানের প্রভাবও রয়েছে যা অবহেলা করার সুযোগ নেই।
অহমবাদী পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয় যখন ব্যক্তি পরিবার, সমাজ বা বন্ধুমহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নিজেকে একা মনে করে। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, টিজিং, সাইবার বুলিং, লোকলজ্জা, টক্সিক প্যারেন্টিংসহ আরও কিছু বিষয় তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি করতে পারে যা অনেকের ক্ষেত্রে আত্মকেন্দ্রিক সংকটে পরিণত হয়। ফলে তারা আবেগ ও হতাশার দহনে দগ্ধ হলেও উপযুক্ত পরিবেশ বা সঙ্গী না পেয়ে নিজেদের অর্থহীন মনে করতে পারে। এসময় পরিবার ও নিকটজনের সান্নিধ্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আবার নিয়মশূন্য আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির চেয়ে সামাজিক কাঠামোর চাপই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পরিবারের চাপ, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক, সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন, পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারা, নির্ভরশীলতা, যোগ্যতা থাকার পরও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, পরিবারের অবহেলা বা যথাযথ দায়িত্ব পালন না করা— এমন অনেক কারণ ব্যক্তিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এমনকি বন্ধুদের ভালো সামাজিক অবস্থানও প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। সব মিলিয়ে এটি এমন এক শূন্যতা তৈরি করতে পারে, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো মানসিকতায় পৌঁছে যায়।
অতি নিয়ন্ত্রিত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত চাপ বা চাহিদা থেকে। ব্যক্তি যখন সেই চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না, তখন আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভালো ফল করার চাপ বা ভালো চাকরি পাওয়ার চাপের কারণ হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা পরিবেশের অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণেও শিক্ষার্থীরা ভারসাম্য হারাতে পারে। অনেক সময় অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়েও তাদের ওপর চাপ তৈরি করা হয়। সব মিলিয়ে এমন এক দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো উপায় নেই মনে করে কেউ মৃত্যুকে একমাত্র মুক্তি হিসেবে বেছে নেয়।
উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করলে দেখা যায়, তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ও প্রবণতার সঙ্গে পরিবার ও পরিবেশের প্রভাব মোটেও অবহেলা করা যায় না। সবার চাপ সহ্য করার ও সঠিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সামর্থ্য সমান নয়। আবেগপ্রবণ মানসিকতা অনেক সময় আত্মহত্যাকে উপযুক্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তাই অভিভাবকদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং কিছু অভ্যাস ত্যাগ করা এবং কিছু বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
সবার আগে দরকার সন্তানদের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাদের চাহিদার প্রতি বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া দেখানো। এ বয়সে অনেক ধরনের চাহিদা থাকে। কখনো একাকিত্ব, আবার কখনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর প্রবণতা দেখা যায়। এসব বিষয় অভিভাবকদের সচেতনভাবে খেয়াল করতে হবে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে সময় কাটানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের ভেতরের জমে থাকা আবেগ প্রকাশ করতে পারে। 
তাদের জন্য মনের কথা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া অভিভাবকদের একান্ত দায়িত্ব। কেবল নিয়মের বেড়াজালে তাদের আবদ্ধ না রেখে মাঝে মাঝে নিয়মের বাইরে গিয়ে সুযোগ দেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সন্তানদের ইচ্ছা ও সামর্থ্য বিবেচনা করে তাদের জন্য মানদণ্ড ঠিক করতে হবে, কেবল অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে নয়। সন্তানদের ব্যর্থতা বা পরীক্ষায় ভালো করতে না পারাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিবার থেকে দূরে থাকা সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, তাদের সুবিধা-অসুবিধার খবর নেওয়া এবং সম্ভব হলে মাঝে মাঝে দেখা করা ভালো ফল দিতে পারে। পারিবারিক কঠিন বিষয়গুলোতে সন্তানদের সতর্কতার সঙ্গে দূরে রাখা ভালো। অনেক অভিভাবক সন্তানদের অতিরিক্ত শাসন বা কঠোর নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চান যা তাদের মানসিক বিকাশ ও স্বাধীনতার জন্য অন্তরায় হয়ে যায়। বয়সের সঙ্গে তাদের স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সন্তানের কোনো সিদ্ধান্ত বা কাজ অভিভাবকের পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু ধমক দেওয়া, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা সম্পর্কের মধ্যে শীতলতা তৈরি করার মধ্যে সমাধান নেই। বরং দরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক পরিবেশে কথা বলা।
সন্তানদের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান হচ্ছে তাদের পরিবার। সে কারণে পরিবারের কাছে তাদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি থাকে। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের হতাশা সন্তানদের সামনে কম প্রকাশ করা এবং তাদের উৎসাহ দেওয়া জরুরি, যাতে সন্তান আস্থা না হারায়। তাদের ভুল কাজে শাসন দরকার কিন্তু এর মাত্রা যেন অতিমাত্রায় না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, সন্তানদের নিয়ম ও শাসনের মধ্যে রাখা প্রয়োজন তাদের উপযুক্ত বিকাশের জন্য। কিন্তু সেই নিয়ম ও শাসন হতে হবে তাদের সহ্যক্ষমতার মধ্যে। নতুবা এর পরিণতি অনেক ক্ষেত্রেই ভালো হয় না।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট

(মতামত লেখকের নিজস্ব)
















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২