
কিছু
কিছু দুর্যোগের ছবি দেখলে সত্যিই ভাষা হারিয়ে যায়। কী লিখব, কী বলব-কিছুই
যেন যথেষ্ট মনে হয় না। নেপালের পাহাড়ে হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ হড়পা বান, বরফ,
পাথর ও কাদার স্রোত আমাদের তেমনই এক অসহায় নীরবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
যে
পাহাড় মানুষকে টানে, যে নদী মানুষকে মুগ্ধ করে, যে পথ ধরে প্রতিদিন
দেশ-বিদেশের পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীরা ছুটে যান—সেই পাহাড়, নদী ও
পথই কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিণত হয়েছে ধ্বংসের উপত্যকায়। পানি, কাদা, বরফ ও
পাথরের প্রবল স্রোত ভাসিয়ে নিয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও যানবাহন। সবচেয়ে
কষ্টের, কেড়ে নিয়েছে মানুষের প্রাণ এবং অসংখ্য পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে
অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
নেপাল বাংলাদেশের মানুষের কাছেও খুব আপন একটি দেশ।
আমাদের দেশের অসংখ্য মানুষ ছুটি পেলেই নেপালের পাহাড়ে ছুটে যান। কাছের
দেশ, তুলনামূলক সহজ ভ্রমণব্যবস্থা এবং অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে
নেপাল বাংলাদেশের পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। সেই নেপালের পাহাড়ে কয়েক
মিনিটের এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক আঘাত যে ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করেছে, তা ভাবলেও
শিউরে উঠতে হয়।
২৬ অগাস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায়
আচমকা নেমে আসে পানির সঙ্গে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত। সবচেয়ে বেশি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রসুয়া জেলা। টিমুরে, রাসুওয়াগাধি, স্যাব্রুবেশি
এবং ভোটে কোশি নদীর উপত্যকা থেকে এই বিপর্যয়ের প্রভাব নুওয়াকোটসহ আরও
কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত
অঞ্চলের গিয়েরং বা কেরুং এলাকাতেও ধস ও বন্যার আঘাত লাগে। বহু গ্রাম,
বাজার, বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও পুরো জনপদ যেন কাদার নিচে
চাপা পড়ে।
দুর্যোগের প্রকৃত কারণ নিয়েও শুরুতে বিভ্রান্তি ছিল। প্রথম
দিকে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা
ইউএসজিএস জানায়, আসলে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। উপগ্রহচিত্র ও প্রাথমিক
বিশ্লেষণে তিব্বতের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ার
প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ
নিচে আছড়ে পড়ে। বিপুল বরফ, মাটি ও পাথর নদীর প্রবাহে যুক্ত হয়ে তৈরি করে
ভয়াবহ জল ও কাদার স্রোত।
অর্থাৎ এটি শুধু সাধারণ বন্যা ছিল না। পাহাড়ের
ওপর একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় কয়েক মিনিটের মধ্যে ভাটির মানুষের জন্য মৃত্যুর
স্রোত তৈরি করেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন-কতজন নিখোঁজ? সংখ্যাটি দ্রুত
বদলে যাচ্ছে। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ থাকার খবর
এসেছে। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলায় চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া
কঠিন। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে কি মানুষের কষ্ট বোঝা যায়?
প্রতিটি মৃত মানুষ
মানে একটি পরিবার। প্রতিটি নিখোঁজ মানুষ মানে একটি পরিবার আশঙ্কা ও আশার
মাঝখানে আটকে থাকা। কতজন মা সন্তানের অপেক্ষায় আছেন, কতজন স্ত্রী স্বামীর
ফোনের অপেক্ষায়, কতজন বাবা-মা হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে ঘুরছেন—তার কোনো
পরিসংখ্যান নেই।
নিখোঁজ একজন মানুষ মানে শুধু একজন মানুষ নিখোঁজ নন।
তার সঙ্গে যেন একটি পুরো পরিবারও অন্ধকারে হারিয়ে যায়। দূরদেশে থাকা কোনো
পর্যটক নিখোঁজ মানে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা তার পরিবারও তখন এক অর্থে
নিখোঁজ-আশা আর আশঙ্কার মাঝখানে। মোবাইলে বারবার কল যাচ্ছে, কিন্তু ওপাশে
কেউ ধরছে না। খবরের ওয়েবসাইট বারবার খোলা হচ্ছে। কোনো তালিকায় প্রিয়জনের
নাম আছে কি না, সেটিই হয়ে উঠছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নেপালের
এই দুর্যোগে বহু বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও বিপদে পড়েছেন। ভারতীয়,
মার্কিন, অস্ট্রেলীয়, ব্রিটিশ, কানাডীয়সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কেউ
নিখোঁজ, কেউ আটকা পড়েছেন। অনেকেই যাচ্ছিলেন তিব্বতের পবিত্র কৈলাস-মানস
সরোবরের পথে। আবার অনেকে ছিলেন নেপালের জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন এলাকায়।
রসুয়অগাধি-গিয়েরং
বা কেরুং পথটি শুধু পর্যটনের পথ নয়। এটি নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে
গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত প্রবেশদ্বার। নেপালের দিক থেকে কাঠমান্ডু, ত্রিশূলী,
ধুনচে, স্যাব্রুবেশি ও টিমুরে হয়ে মানুষ সীমান্তে পৌঁছান। এরপর গিয়েরং হয়ে
তিব্বতের মালভূমি পেরিয়ে অনেকে সাগা, পারিয়াং, মানসসরোবর ও দারচেনের দিকে
এগিয়ে যান। কারও কাছে এটি ব্যবসার পথ, কারও জীবিকার পথ, কারও তীর্থযাত্রার
পথ, আবার কারও বহুদিনের স্বপ্নের ভ্রমণপথ।
এই কারণেই স্থানীয় মানুষের
দুর্ভোগও গভীর। পাহাড়ের বুকের একটি সড়ক তাদের কাছে পর্যটন মানচিত্রের একটি
রেখা নয়; সেটিই বাজারে যাওয়ার পথ, হাসপাতালে যাওয়ার পথ, ব্যবসার পথ,
জীবিকার পথ। একটি সেতু ভেঙে গেলে পর্যটকের ভ্রমণ হয়তো কয়েক দিনের জন্য থেমে
যায়। কিন্তু স্থানীয় মানুষের জন্য সেটি হতে পারে মাসের পর মাস আয়-রোজগারের
পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল এখন
দিন-রাত কাজ করছে। হেলিকপ্টার, ড্রোন, প্রশিক্ষিত কুকুর ও নানা উদ্ধার
সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক,
ভেঙে পড়া সেতু, কাদা ও নদীর প্রবল স্রোত উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে
তুলেছে। তারপরও উদ্ধারকারীরা ছুটছেন। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে একজন মানুষকে
জীবিত পাওয়া মানে শুধু একজনকে উদ্ধার করা নয়-একটি পরিবারকে আবার জীবন
ফিরিয়ে দেওয়া।
নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের সামনে আরেকটি কঠিন প্রশ্নও তুলে ধরে-হিমালয় কি আগের মতো নিরাপদ আছে?
হিমালয়ের
হিমবাহ দ্রুত বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, বরফ গলছে, পাহাড়ের ঢাল
অস্থিতিশীল হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমবাহ ও উচ্চ পার্বত্য
পরিবেশের পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে সতর্ক করছেন। তবে
এই নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে
আরও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-পুরোনো ঝুঁকি-মানচিত্র দিয়ে
নতুন হিমালয়কে বোঝা যাবে না।
২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতেও
বিশাল বরফ ও পাথরের ধস নেমে রিশিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা নদীর উপত্যকায় ভয়াবহ
বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল। দুই শতাধিক মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলেন। নেপালের
সাম্প্রতিক ঘটনা সেই পুরোনো সতর্কবার্তাকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
তাই
এখন প্রয়োজন শুধু উদ্ধার নয়, ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও। পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে
আগাম সতর্কবার্তা কত দ্রুত পৌঁছাবে? হিমবাহের পরিবর্তন কীভাবে পর্যবেক্ষণ
করা হবে? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে? কোনো সড়ক
বা সেতু ভেঙে গেলে বিকল্প উদ্ধারপথ কোথায় থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই
খুঁজতে হবে।
কারণ হিমালয় শুধু নেপালের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারত,
ভুটান, চীন, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃতি, নদী ও জলব্যবস্থা।
হিমালয়ের পরিবর্তনের প্রভাব সীমান্ত মানে না। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায়
আঞ্চলিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে
বেশি জরুরি।
তবে আজ এসব বড় আলোচনা করার আগে আমাদের একটু থামা দরকার। আজ
সবচেয়ে জরুরি সেই মানুষগুলোর কথা ভাবা, যাঁরা এখনো নিখোঁজ। সেই পরিবারের
কথা ভাবা, যারা কোনো খবরের অপেক্ষায় আছে। সেই মায়ের কথা ভাবা, যিনি হয়তো
এখনো বিশ্বাস করছেন তার সন্তান ফিরে আসবে। সেই শিশুটির কথা ভাবা, যে হয়তো
জানে না কেন তার বাবা এখনো বাড়ি ফেরেননি। সেই উদ্ধারকর্মীর কথা ভাবা, যিনি
নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্যের জীবন বাঁচাতে ছুটছেন।
দুর্যোগের সময়ে
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম, জাতি বা দেশের পরিচয় নয়-সে একজন মানুষ।
তাই নেপালের জন্য আমাদের প্রার্থনা শুধু নেপালের জন্য নয়; এটি মানুষের জন্য
প্রার্থনা।
প্রার্থনা করি, নিখোঁজরা যত বেশি সম্ভব জীবিত ফিরে আসুন।
আহতরা দ্রুত সুস্থ হোন। যারা ঘর হারিয়েছেন, তাঁরা নিরাপদ আশ্রয় পান। যারা
স্বজন হারিয়েছেন, তাঁরা এই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করার শক্তি পান। উদ্ধারকাজে
থাকা প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ফিরে আসুন। আর যারা আর কখনো ফিরবেন না, তাদের
জন্য থাকুক গভীর শোক ও শ্রদ্ধা।
নেপালের এই দুর্যোগ আমাদের জন্যও
সতর্কবার্তা। পৃথিবীর আবহাওয়া বদলাচ্ছে, পাহাড় বদলাচ্ছে, বরফ বদলাচ্ছে,
নদীর আচরণ বদলাচ্ছে। আমাদের প্রস্তুতিকেও তাই বদলাতে হবে। মৃত মানুষদের
আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর ভবিষ্যতের প্রাণ
বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে পারি।
হিমালয়ের পথে যারা স্বপ্ন নিয়ে
বেরিয়েছিলেন, তাদের সবার জন্য আজ আমাদের প্রার্থনা। মানুষ আবার পাহাড়ে
যাবে, পথ আবার তৈরি হবে, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের পদচারণায় সীমান্তের জনপদ
আবার মুখর হবে। কিন্তু সেই পথ যেন এবার আরও নিরাপদ হয়-প্রকৃতিকে জয় করার
জন্য নয়, প্রকৃতিকে বুঝে, সম্মান করে এবং তার সঙ্গে সহাবস্থান করেই।
কারণ শেষ পর্যন্ত পাহাড় আমাদের নয়; আমরাই পাহাড়ের অতিথি।
লেখক: কলামনিস্ট।
