
কুমিল্লায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। জেলার ১৭ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা ও জটিল রোগীদের অস্ত্রোপচার পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ছাড়া চিকিৎসা সেবা খাতগুলো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতালে।
হাসপাতালের ব্যস্ততম সময় হিসেবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে রোগীর চাপ বেশি থাকে উল্লেখ করে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পিক আওয়ারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে যথেষ্ট চেষ্টা থাকলেও রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি এমনও দিন যায়- লোডশেডিং এর কারনে সারা দিনে একটিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিং হওয়ায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জটিল রোগীদের অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) লোডশেডিংয়ের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগীরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এতে চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
ডা. হাবিবুর রহমান আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কুমিল্লা পল্লীবিদ্যুৎ-৩ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। মাস দুয়েক আগে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকলেও তখন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই সরবরাহও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার পেন্নাই গ্রামের মরিয়ম বেগম বলেন, হাসপাতালে সারাদিনে দুই/আড়াই ঘন্টার বেশি কারেন্ট থাকে না, এখানে সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসা নিতে এসে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। বিদ্যুতের এত বিভ্রাটের মাঝেও জেনারেটরের কোন ব্যবস্থা নেই; এভাবে মানুষ থাকতে পারে না। হয় বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা করুক না হয় জেনারেটরের ব্যবস্থা করুক।
শুধু দাউদকান্দি নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতেও একই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যেখানে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সীমিত, সেখানে জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় চিকিৎসকদের পড়তে হচ্ছে বাড়তি বিড়ম্বনায়।
বুধবার দুপুরে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় হাসপাতালের বহির্ভাগে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছেন রোগী ও তাদের সজনরা। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকার কারণে গরমের মধ্যেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মহালক্ষীপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদ। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ঘেমে-নেয়ে একাকার তিনি-সহ অন্যান্য রোগীরা। আব্দুর রশিদের স্ত্রী ফরিদা আক্তার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকা এখন তাকে নেবুলাইজার দিতে পারছি না। গরমে পুরো অস্থির হয়ে আছি। তিনি (আব্দুর রশিদ) গরম একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে হাত পাখা দিয়ে তাকে বাতাস করতে হচ্ছে।
যদিও এই উপজেলায় বিদ্যুতের তেমন একটা সমস্যা হয় না বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ড. মনিরুল ইসলাম।
তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ মোটামুটি ভাবে স্বাভাবিকই আছে । কেবল দুপুরের দিকে আনুমানিক এক ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয় । তবে আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিকল্প ব্যবস্থার কারণে ওটি (অপারেশন থিয়েটার) কার্যক্রম ও চিকিৎসা সেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি।"
ব্রাহ্মণপাড়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম জালাল উদ্দিন বলেন, তবে সারা দেশের বিদ্যুতের ঘাটতির তুলনায় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় লোডশেডিং অনেকটাই কম। আশা করছি দ্রুতই তা সমাধান হয়ে যাবে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ভোগান্তির প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে, জেলার প্রধান স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা সদর হাসপাতালসহ প্রায় সব কটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
কুমিল্লার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হেলথ্ এন্ড ডক্টরস এর পরিচালক বদরুল হুদা জেনু বলেন, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যান্ত্রিক ত্রুটি বা সংকট থাকতেই পারে। তবে একজন গ্রাহক ও নাগরিক হিসেবে সেই সংকট সম্পর্কে জানার অধিকার মানুষের আছে। আগে থেকে সংকটের তথ্য জানানো হলে সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে। হঠাৎ বিদ্যুৎ সংকটে শুধু বাসাবাড়ি নয়, উৎপাদনমুখী শিল্প, হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে কুমিল্লায় দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা সমস্যায় পড়েন। তাই যেকোনো সংকটের বিষয়ে গ্রাহকদের আগেই অবহিত করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া জরুরি।
অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার হাসপাতালগুলোতে ভোগান্তির বিষয়ে বুধবার দুপুরে এই প্রতিবেদক যখন জেলা সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলছিলেন তখনও বিদ্যুৎ ছিল না তার কার্যালয়ে। বিদ্যুৎহীন ছিলো সদর হাসপাতাল।
লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগীদের ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে সিভিল সার্জন ডাক্তার আলী নূর মোহাম্মদ বশির বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে প্রায় সময়ই ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে আইসিইউতে যারা ভর্তি রয়েছেন তাদের বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
এছাড়া হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার কারণে এই সময়টাতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে রোগীদের চাপ বেড়েছে। এছাড়া জেনারেটর দিয়ে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব কার্যক্রম চালানোও সম্ভব হয় না। যত দ্রুত সম্ভব এই লোডশেডিং দূর করতে হবে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) বিতরণ অঞ্চল, কুমিল্লা’র প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানান, বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মিলে কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলে ৬ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা অন্তত ১৩০০ মেগাওয়াট। তার মধ্যে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বর্তমানে আমরা পাচ্ছি। এর মধ্যে শুধুমাত্র কুমিল্লা জেলাতেই চাহিদা আছে ১৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট। যার মধ্যে আমরা প্রতিদিনই ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট ঘাটতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানান, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকায় এই লোডশেডিং। এছাড়া গরমের সময় বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা থাকে - যে কারণে লোডশেডিং বাড়ছে।
