
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছর অস্বস্তিকর ও কঠিন সময় পার করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে গেলেন মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন বলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের কথায় আমরা জানতে পেরেছি। কয়েক দিন ধরেই মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি ছিল গণমাধ্যমে অন্যতম আলোচিত বিষয়। গত শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তিনি সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করলে সব জল্পনার অবসান ঘটে। নিয়ম অনুযায়ী হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাকে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘কঠিন সময়’ পার করতে হচ্ছে তাকে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের ‘চেষ্টা’ চালাচ্ছে এবং তাকে কোনো সহযোগিতাও করছে না। সেই আমলে রাষ্ট্রপতির বিদেশ সফর আটকানো, কূটনৈতিক মিশন থেকে ছবি নামিয়ে ফেলা, তার প্রেস উইং অপসারণের মতো গুরুতর অভিযোগও এনেছিলেন তিনি। সে সময় তার পদত্যাগের দাবিতে কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন আন্দোলন করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। তবে সেই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন। অবশ্য এ কথাও জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি পদত্যাগ করতে চান। তবে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও কয়েক মাস তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন।
শুক্রবার এই পদত্যাগের বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে জানাতে গিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘মো. সাহাবুদ্দিন মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও জনগণের ভোটে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়ই। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।’ আমরা মনে করি, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যে দল থেকেই নির্বাচিত হোন না কেন, রাষ্ট্রপতি সব দল-মতের ঊর্ধ্বে। তার প্রতি সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শন রাজনৈতিক শিষ্টাচারেরই অংশ। যেটি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কথায় প্রতিফলিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিন বছর তিন মাস। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। গত ২৪ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় দেশের রাজনীতিতে ঘটে যায় অনেক পরিবর্তন। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে এই সময়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের যাত্রাও শুরু হয় তার মেয়াদকালে। তার মেয়াদে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিকগুলোর একটি হলো, এই তিন বছর তিন মাসের ভেতর তিনি তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনটি সরকারকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পরিবর্তনশীল ও ব্যতিক্রমী সময়ের সাক্ষী হয়ে রইলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর সাংবিধানিক নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকাকালে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলসহ তার কার্যকালে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন ও স্বাক্ষর করেন। এর পাশাপাশি তিনি ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নামে একটি বিশেষ আদেশেও স্বাক্ষর করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘটনাবহুল ও ব্যতিক্রমী সময় পার করে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগপত্রে তিনি তার শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন বলে আমরা জেনেছি। আমরা সাবেক রাষ্ট্রপতির দ্রুত সুস্থতা কামনা করি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতোই তার মঙ্গল কামনা করি। দেশে সাংবিধানিক ধারা থাকুক এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা হোক, এটাই প্রত্যাশা।
